শিশু যৌন নির্যাতন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা সকল পিতামাতার জানা প্রয়োজন - মায়া

শিশু যৌন নির্যাতন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা সকল পিতামাতার জানা প্রয়োজন

শিশু যৌন নির্যাতন সম্পর্কে অনেক অভিভাভক ই উদাসীন।

যৌন নির্যাতন (যৌন নিপীড়ন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়) যে কেউ এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হতে পারে।

যখন কোন শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, তখন তাকে সাধারণভাবে শিশু যৌন নির্যাতন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

শৈশব ও যৌন নির্যাতন

যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এমন ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতায় কিছু সাধারণ মিল পাওয়া যায় , যার মধ্যে রয়েছে:

  • তারা বেশির ভাগ সময় পরিচিত ব্যক্তির দ্বারাই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
  • যৌন নির্যাতন প্রায়ই খুব অল্প বয়সে শুরু হয়।
  • এই নির্যাতন সাধারণত কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না এবং অনেক মাস বা বছর ধরে এটি ঘটেছে।
  • এই নির্যাতন চালিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রায়ই হুমকি দিয়ে এবং মৌখিক বা মানসিক নির্যাতন করে, এবং কখনও কখনও শারীরিক নির্যাতন করে।

ভয়ভীতি যৌন নির্যাতিত শিশুদের সাহায্য চাওয়া বন্ধ করে দিতে পারে

বেশীরভাগ নারী এবং পুরুষ ছোটবেলায় এই নির্যাতনের কথা জানাতে ভয় পেতেন। তাদের ভয় পাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:

  • তাদের নির্যাতনকারী হয়তো তাদের এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছে যদি তারা কাউকে এই নির্যাতনের কথা বলে।
  • তারা অনুভব করেছিল তাদের কথা বলার মত বিশ্বস্ত কেউ নেই।
  • শিশুরা ভাবেনি যে কেউ তাদের বিশ্বাস করবে।
  • তারা ভয় পেয়েছিল যে তাদের হয়ত বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হবে বা বকাঝকা করা হবে।
  • তারা ভেবেছিল যদি তারা জানে তাহলে তারা তাদের মা বা বাবাকে হারাতে পারে বা পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
  • শিশুদের যৌন নির্যাতনের জন্য তারা নিজেদের দায়ী ভেবেছিল।

শিশুদের যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত ভুল্ধারণা এবং সঠিক ব্যাখ্যা


অনেক ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে শিশুদের যৌন নির্যাতন কে ঘিরে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি হল :

  • ‘শিশুরা যৌন নির্যাতন সম্পর্কে কল্পনা করে এবং মিথ্যা বলে’ – এটা সত্য নয়। শিশুরা খুব কমই মিথ্যা বলে বা কল্পনা করে বিশেষত যৌন নির্যাতনের মত ভয়াবহ বিষয়গুলোতে।
  • ‘যে সব পুরুষরা শিশুকালে নির্যাতিত হয়েছে, বড় হয়ে তারা নির্যাতনকারী হয়ে উঠেছে’ গবেষণায় এটা সত্য বলে প্রমানিত হয় নি। তবে অনেকক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।
  • ‘যৌন নির্যাতনের কারণে ছেলে শিশুরা সমকামী হয়ে উঠবে’ – আবার, গবেষণা এই বিষয়টি সমর্থন করে না। তবে অনেকক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।
  • ‘এটা শুধুমাত্র নোংরা বৃদ্ধ বা সমকামী পুরুষরাই শিশুদের যৌন নির্যাতন করে’ – বেশীরভাগ নিপীড়নকারী সকল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে বিষমকামী পুরুষ। কিছু নিপীড়নকারী নারীও হয়ে থাকে।
  • ‘শিশু যৌন নির্যাতন ক্ষতিকর নয়’ – এটা সত্য নয়। শিশুদের যৌন নির্যাতন একটি শিশুর শারীরিক, সামাজিক এবং মানসিক বিকাশের গুরুতর ক্ষতি সাধন করতে পারে, এবং প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তা সম্পর্ক গড়তে এবং মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যৌন নির্যাতন যত দীর্ঘস্থায়ী হবে , ততই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা বাড়বে।
  • ‘শিশুরা এই অত্যাচারীকে উত্তেজিত করে এবং উপভোগ করে’ – এটা সত্য নয়। নিপীড়নকারীরা প্রায়ই তাদের শিকারদের এই মিথ্যাটি বলে।

যৌন নির্যাতনের উপসর্গসমূহ

যারা এই নির্যাতনের শিকার হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন তাদের মূল বার্তা হচ্ছে শিশুদের আচরণের প্রতি মনোযোগ প্রদান করা।

যদি শিশুদের যৌন নির্যাতন করা হয়, তবে যেসব শারীরিক লক্ষণ থাকতে পারে তা হল-

  • যোনি বা মলদ্বার থেকে রক্তপাত
  • যৌন সংক্রামক রোগ সংক্রমণ (এসটিআই)
  • দুর্বল পরিচ্ছন্নতা

এছাড়াও, একটি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তার আচরণে যেসব লক্ষণ প্রকাশ পায় তা হল-

  • আচরণের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, আক্রমণাত্মক আচরণ বা উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে পশ্চাদপসরণ (ফিরে যাওয়া) (উদাহরণস্বরূপ- শৈশবের পরও বিছানায় প্রস্রাব করা )।
  • যৌন আচরণ যা শিশুর বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়।
  • বিষণ্ণতা বা সামাজিকতায় উদাসীনতা।
  • স্কুলে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া (কখনও কখনও বাড়ি যাওয়া এড়ানোর জন্য)।
  • স্ব-ক্ষতিকর আচরণ (উদাহরণস্বরূপ, আত্মবিকৃতি, আত্মহত্যার প্রচেষ্টা বা পতিতাবৃত্তি)।

যৌন নির্যাতন সম্পর্কে শিশুদের সাথে কথা বলা

এটা আবিষ্কার বা সন্দেহ করা পিতামাতা হিসেবে দু:খজনক হতে পারে যে তার শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

বেশিরভাগ মানুষ রাগ, বিষণ্ণতা, শক, অবিশ্বাস, ঘৃণা এবং অসহায়তা সহ বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি অনুভব করতে পারেন।

তবে, মনে রাখবেন:

  • যদি শিশুটি মানসিক চাপের মধ্যে থাকে, তাহলে তাদের কথা বলতে উৎসাহিত করুন। শিশুরা প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করার জন্য প্রথমাবস্থায় সামান্য কিছু তথ্য বলবে। আপনার উচিৎ হবে নিজে শান্ত থাকা এবং শিশুর কাছে আপনার অনুভূতি না জানানো, কারণ জানলে হয়ত শিশুটি পরবর্তীতে আপনাকে আর কিছু নাও বলতে পারে ।
  • নিজের সম্পর্কে শিশুর অনুভূতি গুলি আপনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। যদি শিশুটি আপনার প্রতিক্রিয়াকে ভীতিকর অনুভব করে, তবে শিশুর মধ্যে অপরাধবোধ এবং লজ্জার অনুভূতি শক্তিশালী এবং স্থায়ী করতে পারে।
  • সমর্থন করুন এবং তাদের বলুন যে আপনি তাদের বিশ্বাস করেন।
  • তাদের আশ্বস্ত করুন যে যাই ঘটুক না কেন, এটা তাদের দোষ নয়।
  • শিশুটিকে আশ্বস্ত করুন যে আপনাকে বলে দিয়ে সে সঠিক কাজ করেছে। কারণ অনেক অপরাধী তাদের কৃতকর্মের কথা কারও কাছে প্রকাশ না করার জন্য ভয় ভীতি দেখায়।
  • শিশুটিকে বলুন যে নির্যাতনকারী ব্যাক্তি ভুল কাজ করেছে এবং নির্যাতনকারী এই নির্যাতনের জন্য দায়ী।
  • শিশুকে সান্ত্বনা এবং আশ্বস্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করুন। এরপর আপনি কি পদক্ষেপ নেবেন তা ব্যাখ্যা করুন। আপনি সে সব প্রতিশ্রুতি দেবেন না, যা সন্তানের গোপনীয়তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না। শিশুদেরও যথেষ্ট গোপনীয়তা আছে এবং এই নির্যাতন বন্ধ করার জন্য আপনাকেই তার পক্ষে কাজ করতে হবে।

যৌন নির্যাতনের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করুন

একটি শিশুকে রক্ষা করতে সাহায্য করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা ভীতিকর হতে পারে। আপনার উদ্বেগের কথা জানানোর জন্য একটি শিশুকে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

দরকার শুধুমাত্র একটি যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস যে কোন শিশু বা অল্পবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষতি হচ্ছে অথবা ক্ষতির ঝুঁকি আছে। মনে রাখবেন, আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আপনার উদ্বেগের কথা জানিয়ে আপনার সন্তান এবং অন্যকে এই নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারেন।

এছাড়াও যে কোন ধরণের শিশু নিপীড়ন দেখলে সাহায্যের জন্য ৯৯৯ এ বিনামূল্যে ফোন করে আপনি জরুরী মুহুর্তে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও এ্যাম্বুলেন্স এর সাহায্য নিতে পারবেন।

১০৯ এ কল করে নারী নির্যাতন বা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এবং ১০৯৮ – শিশুদের যে কোন সমস্যা হলে বিনামূল্যে কল করে সেবা নিতে পারেন।

শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারে করনীয়

বিশেষজ্ঞ কাউন্সেলিং এবং এডভোকেসি প্রদান করে, এবং পরিবারের সদস্যদের সমর্থনে শিশুকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় মায়া অ্যাপ ইন্সটল করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Categories