ঘুম কিভাবে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে? - মায়া

ঘুম কিভাবে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে?

ঘুম এর সমস্যা, অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া সারা বিশ্বে একটি সাধারণ সমস্যা। হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৩৩% ঘুমের সমস্যায় ভুগেন।

এমনকি যাদের ক্রনিক ইনসোমনিয়া নেই তারাও প্রায়ই ঘুমের সমস্যার সাথে সংগ্রাম করে। 

ঘুম এর অভাবে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরুপ প্রভাব পড়তে পারে।মায়ার মনোসামাজিক বিশেষজ্ঞ তানজিলা ইফাত তাসকিনের মতে 

ঘুমের সমস্যা বেশিরভাগ সময় সাধারণত আমাদের মানসিক দুশ্চিন্তা, ভয়, উৎকন্ঠা বা হতাশাবোধের ফলাফল হয়ে থাকতে পারে। শুরুতেই যদি বিষয়টি বুঝতে পারেন তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখুন।

চলুন মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে ঘুমের কি সম্পর্ক তা বিস্তারিত পড়ে জেনে নেই। 

ঘুম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক  

ঘুম শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঘুমের সমস্যা হলে তা সাময়িকভভাবে  আপনার ক্লান্তি ও বিরক্তির কারণ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

ঘুমের অভাবে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং বিষণ্ণতা সহ বেশ কিছু জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। 

কিছু মানসিক অবস্থা ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, এবং ঘুমের ব্যাঘাত বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডার সহ অনেক মানসিক অবস্থার লক্ষণ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। 

ঘুম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক জটিল। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে ঘুম বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ন্ত্রণে এবং অবস্থার উন্নয়নে ভুমিকা রাখে। 

অন্য ভাবে বলতে গেলে, ঘুমের সমস্যার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

আবার  আপনার যদি মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো না হয় তবেও ঘুমের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।

ঘুমের অভাবে কিছু মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে পারে, যদিও গবেষকরা এর অন্তর্নিহিত কারণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নন।

আপনার ঘুমের প্যাটার্ন এবং আপনার মানসিক অবস্থার মধ্যে এই বৃত্তাকার সম্পর্কের কারণে, আপনার যদি ঘুম এ সমস্যা থাকে  তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলা জরুরী।   

মানসিক চাপ বা স্ট্রেস এর উপর প্রভাব

সারাদিন পরিশ্রমের পর রাতে ঘুমাতে গিয়ে যদি আপনাকে এপিঠ ওপিঠ করতে হয় তবে তা পরবর্তী দিন আপনার মুড সুইং, খিটখিটে মেজাজ এবং মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। 

ঘুম কম হলে সামান্য মানসিক চাপ মোকাবেলা করাও অনেক কঠিন হয়ে উঠে।দৈনন্দিন ঝামেলা হতাশার প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে।

আপনি হয়ত নিজেকে বিদ্ধস্ত বা খিটখিটে মেজাজের অনুভব করতে পারেন এবং দৈনন্দিন বিরক্তির কারণে হতাশ বোধ করতে পারেন।

দুর্বল ঘুম নিজেই আপনার মানসিক চাপের উৎসে পরিণত হতে পারে।

আপনি হয়ত অনুভব করছেন একটি ভালো ঘুমের প্রয়োজনীয়তা কিন্তু পরক্ষণেই বোধ করছেন যে আপনার হয়ত  ঘুম  ভালো হবে না। 

ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতার উপর প্রভাব 

অনিদ্রা এবং অন্যান্য ঘুমের সমস্যা বিষণ্ণতার একটি লক্ষণ হতে পারে, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে আসলে বিষণ্ণতা সৃষ্টি করতে অনিদ্রার ভুমিকা রয়েছে। 

২১টি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণার একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যাদের ঘুমের সমস্যা নেই তাদের তুলনায় যারা অনিদ্রা রোগে ভুগছেন তাদের  বিষণ্ণতায় ভোগার ঝুঁকি দ্বিগুণ ।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে ঘুমের সমস্যার কমিয়ে কি ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা কমানো সম্ভব হবে? 

অনিদ্রার চিকিত্সা অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় এবং সমস্যা কমানোর অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে। 

৩,৭০০ জনেরও বেশী অংশগ্রহণকারীর উপর একটি গবেষণায় গবেষকরা বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং আতঙ্কের লক্ষণের উপর দুর্বল ঘুমের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কয়েকজনকে তাদের অনিদ্রার জন্য কংগনিটিভ বেহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি) দেওয়া হচ্ছিল, অন্যদিকে অন্যরা কোন চিকিৎসা পাননি।

গবেষকরা দেখেছেন যে যারা সিবিটি পেয়েছেন তাদের বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ভীতি এবং দুঃস্বপ্ন উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এছাড়াও তারা রিপোর্ট করেছেন যে তাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে এবং তাদের বাড়িতে ও কর্মক্ষেত্রে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

উদ্বেগ বা এংজাইটি 

অন্যান্য মানসিক সমস্যার মত, ঘুম এবং উদ্বেগের মধ্যে সম্পর্ক ও উভমুখী। যাদের উদ্বিগ্নতা আছে তাদের ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ার প্রবণতা বেশি।

আপনি উদ্বিগ্ন থাকলে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে। উপরন্তু, ঘুমের সমস্যা উদ্বিগ্নতা বিকাশের জন্য একটি ঝুঁকি স্বরূপ । 

যখন আপনার ঘুমের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন আপনার উদ্বেগের পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে। 

উদাহরণস্বরূপ, অনিদ্রা শুধুমাত্র পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) এর একটি সাধারণ লক্ষণ নয়, এই রোগে আক্রান্ত ৮০% থেকে ৯০% মানুষের মধ্যে এই রোগ বৃদ্ধির জন্য ঘুমকে দায়ী করা হয়। 

তবে একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে তীব্র অনিদ্রার কারণে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদেরও উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়।   

বাইপোলার ডিসঅর্ডার

বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ঘুমের ব্যাঘাত খুবই সাধারণ। এই ধরনের সমস্যার মধ্যে থাকতে পারে অনিদ্রা, বারবার ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া, এবং দুঃস্বপ্ন।

এতে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে খুব মেজাজী আবার হঠাৎ হঠাৎ খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। কম ঘুম এছাড়াও উন্মাদনা বা হাইপোম্যানিয়ার লক্ষণ হতে পারে।

কম ঘুম এছাড়াও উন্মাদনা বা হাইপোম্যানিয়ার লক্ষণ হতে পারে।

গবেষকরা পরামর্শ দেয় যে ২৫% থেকে ৬৫% অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ম্যানিয়াক শুরু হওয়ার আগে স্বাভাবিক ঘুম/জাগরণ চক্রের পরিবর্তন হয়েছে।

তাই ঘুমের সমস্যা হলে অবশ্যই অবহেলা করবেন না। 

এডিএইচডি

মনোযোগ-ঘাটতি হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার (এডিএইচডি) একটি সাধারণ মানসিক অবস্থা, যা ছয় থেকে সতেরো বছর বয়সী শিশুদের উপর প্রভাব ফেলে। 

এডিএইচডি ঘুমের সমস্যার সাথে যুক্ত, এবং গবেষণা পরামর্শ দেয় যে ঘুমের ব্যাঘাত এই রোগের আগমণের কারন হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে ২৫% থেকে ৫৫% শিশু যাদের এডিএইচডি আছে তারা ঘুমের সমস্যায় ভুগে। 

এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের ঘুম সংক্রান্ত বেশ কিছু সমস্যা হতে পারে যার মধ্যে রয়েছে-

  • ঘুম আসাতে অসুবিধা
  • একটানা ঘুমে ব্যাঘাত
  • ঘুম থেকে উঠতে অসুবিধা
  • ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা
  • রাতে জেগে ওঠা এবং দিনের বেলা ঘুম

গবেষণায় দেখা গেছে যে ঘুমের  সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শিশুর সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি এডিএইচডি উপসর্গগুলোর তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।

ঘুম কম হলে কি করবেন? 

সুখবর হল যে যেহেতু ঘুমের সমস্যা সাধারণত সমাধানযোগ্য এবং ভালো ঘুম মানসিক রোগের লক্ষণগুলি দূর করতে সাহায্য করতে পারে।

এর মানে এই নয় যে বেশি ঘুমালে রোগ নিরাময় হয়ে যাবে বা দ্রুত সমাধান পাবেন বরং ভাল ঘুম আপনার চিকিৎসা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

এছাড়াও ভালো ঘুমের জন্য নিজের জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যকর কিছু পরিবর্তন আনুন। দেখবেন ঘুম যেমন ভালো হবে মনও ভালো থাকবে।   

মানসিক যে কোন সমস্যায় মায়া অ্যাপটি ইন্সটল করে প্রশ্ন করুন।

Leave a Reply

Categories