কাউকে যৌন হয়রানি এর শিকার হতে দেখলে কি করবেন? - মায়া

কাউকে যৌন হয়রানি এর শিকার হতে দেখলে কি করবেন?

যৌন হয়রানি আমাদের সমাজে নারীদের পথচলায় একটি বড় বাঁধা। তবে, কিছু ছোট পদক্ষেপে আপনার চোখের সামনে হঠাৎ ঘটে যাওয়া হয়রানির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

সত্যিকার অর্থে যারা যৌন হয়রানি করেন তাদের মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা যৌন হয়রানি এর ভুক্তভোগী তাদের মানসিক ভাবে সাপোর্ট দিয়েও আমরা তাদের দুঃখ ভাগ করে নিতে পারি।

হলিউডের বিখ্যাত প্রযোজক হার্ভে ওয়েনস্টাইনের কর্তৃক যৌন হয়রানির শিকার হয়ে কিছু হাই প্রোফাইল অভিনেত্রীর মুখ খোলার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে #Me Too আন্দোলনের জনপ্রিয়তা পায়।

যদিও এর অনেক আগেই আমেরিকান সমাজকর্মী তারানা ব্রুক সামাজিক নেটওয়ার্কিং প্লাটফর্ম মাইস্পেসে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি প্রবর্তন করেন।

এই #Me Too ঘটনা থেকে বোঝা যায় সারাবিশ্বে সর্বস্তরের নারীরা কিভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

কিন্তু, দুঃখের বিষয় হল সবাই জানলেও কেউ কিছু করেন না বা কিছুদিন আওয়াজ তুলে ভুলে যান।

এটি “বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট” বা “বাইস্ট্যান্ডার অ্যাপ্যাথি” নামে পরিচিত অর্থাৎ যখন অনেক লোকের সামনে কোন কোন হয়রানি বা দুর্ঘটনা ঘটে কিন্তু কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে না।

অনেক কারণে সমাজে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কারণ হতে পারে-

  • আপনি কিছু করার ক্ষমতা নেই বলে মনে করেন
  • আপনি জানেন না এ পরিস্থিতির সমাধানের জন্য কি বলতে হবে বা কি করতে হবে
  • হতে পারে আপনি সহায়তা করতে চান না
  • আপনি এমন কিছুর মধ্যে নাক গলাতে চান না যা আপনার নিজস্ব কোন ঝামেলা নয়

কিন্তু, জানেন কি,যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভিকটিমকে জানানো যে সে একা নয়।

তাহলে, আপনি যদি কাউকে রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে, বাসে, বা অন্য কোথাও যৌন হয়রানির শিকার হতে দেখেন, আপনি সাহায্য করার জন্য কি করতে পারেন?

বিস্তারিত পড়ে জেনে নিন-

১। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করুন

আপনি কিছু করার আগে, আপনাকে ঠিক কি পরিস্থিতি এবং আপনি কতটা হস্তক্ষেপ করতে পারেন তা বের করতে হবে।

এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না, কারণ এটা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন তুমি কি নিরাপদে আছো? শারীরিক ক্ষতির জন্য কি তাকে হয়রানি করা হচ্ছে? হস্তক্ষেপ করলে কি পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে? আশেপাশে কি অন্য কেউ আছে যারা আপনাকে সমর্থন করতে পারে?

২।সরাসরি হস্তক্ষেপ

আপনি যদি মনে করেন যে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা নিরাপদ, তাহলে আপনি সরাসরি এই হয়রানির ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারেন।

অর্থাৎ যে হয়রানি করছে তাকে সরাসরি সম্বোধন করা। আর তাদের আচরণে বাধা দেয়ার জন্য কখনও ক্ষমা চাইবেন না, এটা আপনার আচরণের দৃঢ়তার পরিচয়।

হোলাব্যাক!, হয়রানি বন্ধ করার জন্য একটি বৈশ্বিক আন্দোলন – এর মতে, এমন কিছু বলুন যা আপনার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।

কিছু উদাহরণ হল: “এটা হয়রানিমূলক”, অথবা “তাদের সাথে এভাবে কথা বলবেন না” অথবা “এটি ঠিক নয়”।

আপনি যা বলবেন তার জন্য খুব বেশি চিন্তার কিছু নেই, আপনি শুধুমাত্র ব্যক্তিকে সচেতন করবেন যে তারা যা করছে তা ভুল।

যদি হয়রানিকারী সাড়া দেয়, তবে হোলাব্যাক বলেন, কোন বিতর্কে জড়াবেন না। তার বদলে, ভিকটিমকে সহায়তা করুন।

৩।যৌন হয়রান কারীর মনোযোগ নষ্ট করুন

আপনি যদি হয়রানিকারীর সাথে মিথস্ক্রিয়া না করেন, অথবা মনে হয় যে আপনি যদি তা না করেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে তবে তার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।

ভিকটিমের সহায়তায় জন্য ঐ বিষয়ে কথা বলে নয়, বরং সম্পূর্ণ অসম্পৃক্ত বা অন্য কিছু নিয়ে কথা বলতে পারেন।

আপনি হারিয়ে যাওয়ার ভান করতে পারেন, সময় জিজ্ঞাসা করতে পারেন, তাদের পরিচিত ভেবে শুভেচ্ছা জানাতে পারেন।

আপনি তাদের আপনার সাথে হাঁটতে যাওয়ার বা অন্য কোন কাজের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারেন।

ঘটনার মোটিভ পাল্টে দেওয়ার এটি একটি কার্যকর উপায় হতে পারে তবে, আপনি এটা তখনই করবেন যখন নিজেকে নিরাপদ মনে করবেন।

৪। আপনাকে সমর্থন করার জন্য কাউকে খুঁজুন

আপনি যদি ব্যক্তিগতভাবে জড়িত হতে না চান, তাহলে আপনি এমন কাউকে খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারেন যিনি এই পরিস্থিতির সমাধান করতে পারেন।

পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে যেমন- বাসে হলে বাসের অন্য যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ, রাস্তায় হলে ট্রাফিক পুলিশ বা টহল পুলিশ, স্কুলে হলে শিক্ষক কিংবা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাউকে জানাতে হবে।

এছাড়া ৯৯৯ এ বিনামূল্যে ফোন করে আপনি জরুরী মুহুর্তে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও এ্যাম্বুলেন্স এর সাহায্য নিতে পারবেন।

১০৯ এ কল করে নারী নির্যাতন বা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এবং ১০৯৮ – শিশুদের যে কোন সমস্যা হলে বিনামূল্যে কল করে সেবা নিতে পারেন।

৫। যৌন হয়রানি এর শিকার ব্যক্তির সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিনা জিজ্ঞেস করুন

কখনও কখনও যৌন হয়রানি এত দ্রুত ঘটে যেখানে আপনার হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে চিৎকার করে কিছু বলল বা হঠাৎ করে গায়ে হাত দিয়ে পালিয়ে গেলে।

যদি এমনটা হয় তবুও কিন্তু আপনি ভিকটিমকে সাহায্য করতে পারেন।তাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন সে ঠিক আছে কিনা, তার কোন সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিনা।

সে বিচলিত বোধ করলে আপনি তাকে মানসিক সাপোর্ট দিতে পারেন কথা বলে বা তার পরিচিত কাউকে ফোনে জানিয়ে।

ভিকটিমকে বাসায় বা নিকটস্থ থানায় বা হাসপাতালে পৌঁছে দিতে সাহায্য করতে পারেন।

৬। যৌন হয়রানি এর ঘটনাটি নথিভুক্ত করুন

যদি কেউ ইতোমধ্যে ভিকটিমকে সাহায্য করে থাকে এবং আপনি এই ঘটনায় অতিরিক্ত ভিড় করতে না চান, তাহলে আপনি ঘটনা নথিভুক্ত করে সাহায্য করতে পারেন।

এটা অবশ্যই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে করবেন, যেমন- আপনি যদি আপনার ফোনে ভিডিও করেন তাহলে আপনার দূরত্ব বজায় রাখুন।

কখনও কখনও অপরাধী যদি জানে যে তার কুকীর্তি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে তবে তা তাকে ভড়কে দেবার জন্য যথেষ্ট তবে সবক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে।

এই ঘটনা ক্যামেরায় থাকলে যে ব্যক্তি হয়রানির শিকার হয়েছে সে যদি তা রিপোর্ট করতে চায়, তাহলে তাকেও সাহায্য করতে পারে।

এটি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সাহায্য করতে পারে যদি আপনি নিকটবর্তী ল্যান্ডমার্কগুলির, ঘটনার সময় এবং তারিখ উল্লেখ করতে পারেন।

কিন্তু যৌন হয়রানি ঘটনা শেষ হয়ে গেলে ভিকটিমকে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করবেন যে সে এই ফুটেজ নিয়ে কি করতে চায়। ধর্ষণ জাতীয় গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হতে দেখলে অবশ্যই পুলিশকে অবহিত করুন।

ভিকটিমের অনুমতি ছাড়া ভিডিও বা অডিও অনলাইনে প্রকাশ করবেন না।কিংবা কাউকে দিবেন না এতে সে পরবর্তীতে ব্লাকমেইলের শিকার হতে পারে।

আবার, অনেক সময় এটি ভুক্তভোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বাঁধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অবশ্যই আপনার সাথে ঘটে যাওয়া হয়রানির অভিযোগ করুন থানায়। অন্যকেও অভিযোগ করতে উৎসাহিত করুন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে। আর এজন্য আমাদের নিজেদের চুপ করে থাকাটাও অনেকাংশে দায়ী।

ফলে, অপরাধী ছোট ছোট অপরাধ থেকে পার পেয়ে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠার সুযোগ পাচ্ছে।

তাই চোখের সামনে অপরাধ হতে দেখলে সহায়তা করুন। শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় মায়া অ্যাপ ইন্সটল করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Categories