রজবন্ধ বা মেনোপজ নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার সঠিক ব্যখ্যা - মায়া

রজবন্ধ বা মেনোপজ নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার সঠিক ব্যখ্যা

‘‘রজবন্ধ’’ বা মেনোপজ, অর্থাৎ নারীদের মাসিক ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে যাওয়া। এ সময় হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশে অধিকাংশ নারীই মনোপজ নিয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়। এমনকি উন্নত বিশ্বের নারীদের মাঝেও এ নিয়ে যথেষ্ট সচেতনতার অভাব রয়েছে।

রজবন্ধের পরে মাত্রাতিরিক্ত হাড় ক্ষয়ে যায় বহু মহিলার। পঞ্চাশ পেরোতে না পেরোতেই অস্টিওআর্থারাইটিসে পঙ্গু হয়ে যান অনেকে। অনেকে দুলে দুলে হাঁটতে বাধ্য হন আর অনেকের দেহ বেঁকে যেতে থাকে ধনুকের মতো। আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়।

অনেকটা গল্পের কুজোবুড়ির মত। কাজের গতিরোধ হয়। তবু নারীস্বাস্থ্যের ব্যাপারে চিরকালীন সামাজিক ঔদাসীন্য বহাল।

আপনি কি এসব উপসর্গগুলো আপনার প্রিয়জনদের মাঝে দেখেছেন? হয়ত দেখেছেন কিন্তু উপলব্ধি করেননি।

মায়ার ডা সাদিয়া ইসলাম এর কাছে থেকে জেনে নিন রজবন্ধ এবং এ সম্পর্কিত ভ্রান্তধারণাগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা।

রজবন্ধ বা মেনোপজ কি?

রজবন্ধ হল নারীর ঋতুচক্র এবং ফার্টিলিটির সমাপ্তি। এটা ঘটে যখন:

  • আপনার ডিম্বাশয় আর ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন ফার্টিলিটির জন্য প্রয়োজনীয় দুটি হরমোন তৈরি করে না।
  • আপনার পিরিয়ড ১ বছরের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে।

মেনোপজ স্বাভাবিকভাবেই বয়সের সাথে সাথে ঘটে। কিন্তু এটা অস্ত্রোপচার, রোগের চিকিৎসা বা অসুস্থতা থেকেও উদ্ভূত হতে পারে।

এসব ক্ষেত্রে এটাকে কারণের উপর নির্ভর করে প্ররোচিত বা ইনডিউসড মেনোপজ, সার্জিক্যাল মেনোপজ বা প্রাথমিক ডিম্বাশয়ের অপ্রতুলতা বলা যেতে পারে।

মেনোপজ নিয়ে যত ভ্রান্তধারণা ও সঠিক ব্যখ্যা

ভুল ধারণা#১: রজবন্ধ মানে আপনার যৌন জীবন শেষ

আপনি ১০০% একটি সুখী এবং সুস্থ যৌন জীবন পেতে পারেন। শুধুমাত্র আপনার একটি লুব্রিকেন্ট এর প্রয়োজন হতে পারে। কারণ আপনার ডিম্বাশয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ইস্ট্রোজেনও কমে যায়। কম ইস্ট্রোজেন সঙ্গে, যোনি টিস্যুতে রক্ত প্রবাহ কমে, যার মানে আরো শুষ্কতা।

এক্ষেত্রে, আপনি যদি যৌন আকাঙ্ক্ষা বোধ করেন তবে পিএইচ ভারসাম্যপূর্ণ, প্রিজারভেটিভ-ফ্রি, এবং কম ওসমোলিটি আছে এমন লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করুন।

অন্যথায় আপনার যৌন জীবন আপনার জন্য যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠতে পারে।

ভুল ধারণা#২: হরমোন থেরাপি বিপজ্জনক

কম ঝুঁকিপূর্ণ মেনোপজ হলে এবং মেনোপজ হওয়ার ১০ বছরের মধ্যে নিরাপদ হরমোন থেরাপি তে হট ফ্ল্যাশ, অনিদ্রা এবং স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকলে তবে হরমোন থেরাপি চালিয়ে যেতে পারেন।

তারপরেও, হরমোন থেরাপি সবার জন্য নয়, যাদের স্তন বা জরায়ুর ক্যান্সার হয়েছে; কারণ ছাড়া জরায়ু রক্তপাত; লিভারের অসুখ; রক্ত জমাট বাঁধা; এবং/ অথবা কার্ডিওভাসকুলার রোগ তারা এ থেরাপি নিতে পারবেন না।

ভুল ধারণা#৩: রজবন্ধ আপনার ৫০ বছর বয়সে ঘটে

হ্যাঁ, মেনোপজের গড় বয়স ৫১, কিন্তু এই বয়সই নির্ধারিত নয়। মেনোপজের সময় জেনেটিক্সের উপর খুবই নির্ভরশীল। তবে, আপনি যদি ধূমপায়ী হন এবং/অথবা ক্রনিক অসুস্থতা বা অটোইমিউন ডিজিজ, যেমন মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা লুপাস থাকে তাহলে, আপনার আগাম মেনোপজের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

এটি একটি ভুল ধারণা যে, আপনার ঋতুস্রাব আগে শুরু হলে, আপনি আগে মেনোপজের মধ্যে দিয়ে যাবেন।

ভুল ধারণা#৪: ওজন বৃদ্ধি অনিবার্য

অনেক মহিলা মেনোপজের সময় কিছু অতিরিক্ত পাউন্ড জমা করে, হরমোন পরিবর্তনের কারণে তখন বিপাক ক্রিয়া শ্লথ হয়ে যায়। দৈনিক ২০০থেকে ৩০০ কম ক্যালোরি গ্রহণ আপনার প্রাক-মেনোপজ ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম-এ ২০১৮ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, হরমোন থেরাপি পেটের চর্বি সীমিত করার জন্য একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

একই সময়ে, শারীরিক একটিভিটির অভাব এবং বিঘ্নিত ঘুমের প্যাটার্ন এছাড়াও কিছু এজিং ফ্যাক্টর ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী।

নিয়মিত ব্যায়াম করা, সুষম খাদ্য খাওয়া, এবং প্রচুর বিশ্রাম ওজন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে।

ভুল ধারণা#৫: হট ফ্ল্যাশ দীর্ঘস্থায়ী হয় না

স্বভাবতই এটি চিরস্থায়ী লক্ষণ নয়, সবচেয়ে তীব্র হট ফ্ল্যাশ প্রায়ই মেনোপজের প্রথম দুই থেকে তিন বছরে মধ্যে ঘটে। জীনগত কারণে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে মহিলাদের হট ফ্ল্যাশ এর স্থায়িত্বতা ভিন্ন হতে দেখা যায়।

অ্যালকোহল, তামাক, ক্যাফেইন, এবং মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলা হট ফ্ল্যাশ কমাতে কার্যকর।

এছাড়া, হরমোন থেরাপি এবং লো-ডোজ এন্টিডিপ্রেসেন্ট হট ফ্ল্যাশ কমাতে ভুমিকা রাখতে পারে।

ভুল ধারণা#৬: অস্টিওপরোসিসের ফলে হাড় ক্ষয় অনিবার্য

যখন ইস্ট্রোজেন কমে যায়, তখন হাড় ক্ষয় হতে পারে। যাইহোক, মেনোপজ শুরু করার সময় আপনার হাড়ের ঘনত্ব যত বেশি থাকে, আপনার অস্টিওপরোসিসের সম্ভাবনা তত কমে যাবে।

আপনি যদি ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার এবং পানীয় খেয়ে মেনোপজে প্রবেশ করেন এবং নিয়মিত ওজন বহনকারী ব্যায়ামের ইতিহাস থাকে, তাহলে আপনার এধরণের সমস্যা কম হবে।

ভুল ধারণা#৭: ভুলে যাওয়া ব্যাধি

নাম ভুলে যাওয়া, চাবি ভুল করা, দরজা বন্ধ করা হলে বারবার পরীক্ষা করা- নারী এবং পুরুষদের জন্য বয়স বাড়ার সাথে সাথে সাধারণ একটি বিষয়। যেহেতু মেনোপজের গড় বয়স ৫১ বছর, আর এ বয়সে মস্তিষ্কের ধোয়াশা এবং দৈনন্দিন বিবরণ মনে না রাখা আরো লক্ষণীয় হয়ে ওঠে তাই অনেকে এটাকে এসবের জন্য দায়ী মনে করে।

কিন্তু এটা মেনোপজের কারণে নয়।ভুলে যাওয়ার আরও বেশ কিছু কারণ আছে, যার মধ্যে রয়েছে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অপুষ্টি, মানসিক চাপ এবং থাইরয়েডের অকার্যকারিতা।

ভুল ধারণা#৮: হরমোন চিকিৎসা ছাড়া আর কোন চিকিৎসা নেই

আচরণগত এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন মেনোপজের সাথে সম্পর্কিত মৃদু উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।

যেমন- যে সব মহিলাদের খাদ্য ফল এবং শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস থাকে তারা মেনোপজের উপসর্গ কম বোধ করেন।

যোগব্যায়াম, মেডিটেশন এবং ভেষজ প্রতিকার এ অনেকে উপকৃত হন।

অন্যদিকে, ক্ষতিকর অভ্যাস, যেমন ধূমপান, অলস বসে থাকা এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল এবং ক্যাফেইন গ্রহণ মেনোপজের উপসর্গ বাড়িয়ে তুলতে পারে।

আপনার প্রিয়জন যদি মেনোপজ বা রজবন্ধ চলাকালীন সময়ে শারীরিক ও মানসিক কোন জটিলতা বোধ করে তবে তাকে সচেতন করুন এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Categories