কিটো ডায়েট এর জনপ্রিয়তা ঊর্ধ্বমুখী, কিন্তু এটি কতটা নিরাপদ? - মায়া

কিটো ডায়েট এর জনপ্রিয়তা ঊর্ধ্বমুখী, কিন্তু এটি কতটা নিরাপদ?

কিটো ডায়েট আজকাল খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। খুব অল্প সময়ে বেশি পরিমাণে ওজন কমানো এ জনপ্রিয়তার মূল কারণ। 

অনেকে এটিকে “কিটোজেনিক ডায়েট” বা “লো-কার্ব ডায়েট” বলেও জানে।

কিটো ডায়েট মূলত হাসপাতালে ভর্তি মৃগী রোগে আক্রান্ত, কোমাতে চলে যাওয়া শিশুদের উপসর্গ পরিমিত করতে সাহায্য করার জন্য পরিচিত।

প্রবক্তারা বলেন যে এই খাদ্য দ্রুত ওজন হ্রাস করতে পারে এবং একজন ব্যক্তিকে আরো শক্তি প্রদান করতে পারে।

কিটো ডায়েট এর, সমালোচকরা বলেন যে এই খাদ্য ওজন কমানোর একটি অস্বাস্থ্যকর উপায় এবং কিছু ক্ষেত্রে এটি স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি বিপজ্জনক হতে পারে।

কিটোসিস কি?

“কিটো” ডায়েট হল খাদ্যতালিকাতে কম বা একেবারেই কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য বাদ দেওয়া যা শরীরকে কিটোসিসের  পর্যায়ে নিয়ে যায়। এই ডায়েটে চর্বি বা ফ্যাট গ্রহন করা হয় অনেক বেশি পরিমানে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

কিটোসিস  ঘটে তখন যখন মানুষ কম বা লো-কার্ব খাবার খায় এবং কিটোন নামের অণুগুলো তাদের রক্তস্রোতে তৈরী হতে থাকে।

কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা কম থাকায় রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায় এবং শরীর শক্তি হিসেবে ব্যবহারের জন্য জমে থাকা বা গ্রহন করা চর্বি ভাঙ্গতে শুরু করে।

কিটোসিস আসলে কিটোএসিডোসিসের একটি মৃদু রূপ। কিটোএসিডোসিস  বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাইপ-১ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে।

আবার, অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন যে কেটোসিস সবার জন্য ক্ষতিকর নয়।

যাইহোক, দাবি করা হয় যে কম কার্বোহাইড্রেট ডায়েটে থাকা রোগীরা এক বছরের মধ্যে তাদের হারানো ওজন ফিরে পায়।

কখন কিটো ডায়েট উপকারি?

কিটো ডায়েট তৈরি করেছেন ইতালির রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারির সহযোগী অধ্যাপক ড. জিয়ানফ্রাঙ্কো কাপেলো।

তিনি হাজার হাজার ব্যবহারকারীর মধ্যে ব্যাপক সাফল্য পাওয়ার দাবি করেন। তার গবেষণায়, ১৯,০০০ এর ও বেশী রোগীদ্রুত ওজন হ্রাস করে, কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়, এবং অধিকাংশই এক বছর পরে ওজন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

রিপোর্টে ফলাফল অনুযায়ী, কিটো ডায়েটের ২.৫ সাইকেলের পর রোগীরা গড়ে ১০.২ কিলোগ্রাম বা প্রায় ২২ পাউন্ড হারিয়েছে।

ক্যাপেলো উপসংহার টেনেছেন যে এই খাদ্য অতিরিক্ত ওজন এবং মোটা ব্যক্তিদের ওজন কমানোর জন্য একটি সফল উপায় ছিল। এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, যেমন ক্লান্তি সহজেই ম্যানেজ করা সম্ভব হয়েছিল।

ডাক্তারদের মতে কিটো ডায়েট মৃগী রোগের চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে; এটা ঠিক কেন তা জানা যায় নি, কিন্তু কিটোজেনিক অবস্থায় খিচুনির মাত্রা কমে যায়।

পশুর উপর গবেষণায় দেখা যায় যে, এই ডায়েট অ্যান্টি-এজিং, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, এবং ক্যান্সার প্রতিহত করতে সহায়তা করতে পারে।

কিটো ডায়েট কখন অপকারী?

কিটো ডায়েট অনেকটা বিতর্কিত, একটি সাধারণ ওজন কমানোর ডায়েট  হিসেবে। কিছু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এর অপ্রীতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখিয়ে এটি একেবারেই বর্জনীয় মনে করেন।

এমনকি অনেক কিটো ডায়েট প্রবক্তা স্বীকার করেন যে, যদি ডায়েট “সঠিক উপায়” না করা হয়, তাহলে তা স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর হতে পারে।

প্রথমদিকে ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যাক্তিরা এর সুফল পান কারন কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার গ্রহন করার ফলে রক্তের শর্করা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ফ্যাট জাতীয় খাবার গ্রহনের ফলে রক্তের শর্করা খুবই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

এই কারনে তারা মনে করেন এই ডায়েট করলে তাদের আর মেডিসিন গ্রহনের প্রয়োজন পড়বে না, ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকবে, সেইসাথে ওজনও ঠিক থাকবে।

তবে এটা মনে রাখতে হবে, আমাদের শরীরের স্বাভাবিক শক্তিচাহিদার মূল যোগানদাতা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার, ফ্যাট জাতীয় খাবার নয়।

কিটো ডায়েট বেশি দিন চললে ডায়বেটিস রোগীদের অন্যান্য শারীরিক জটিলতা যেমন -উচ্চরক্তচাপ, কিডনি ফেইলিওর, হার্ট ডিজিজ এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

তবে অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্যও কিন্তু এটা কম ঝুকিপূর্ন নয়, মানে পরিনতি মৃত্যুও হতে পারে।

হ্যাঁ, আপনি হয়ত কিটো ডায়েটের মাধ্যমে পাউন্ড ঝরিয়ে ফেলতে পারবেন, কিন্তু আপনার নিম্নলিখিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা জটিলতা সম্পর্কেও খেয়াল রাখা উচিত।

স্বল্পমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বেশ কিছু স্বল্পমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে যা থেরাপির শুরুতে দেখা যায় , বিশেষ করে যখন রোগীরা প্রথম এই ডায়েট  শুরু করে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া এই ক্ষেত্রে একটি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, এবং লক্ষণীয় লক্ষণগুলির মধ্যে থাকতে পারে:

  • অতিরিক্ত তৃষ্ণা
  • ঘন ঘন প্রস্রাব
  • ক্লান্তি
  • ক্ষুধা
  • বিভ্রান্তি, উদ্বেগ এবং/অথবা জ্বালা
  • ট্যাকিকার্ডিয়া
  • মাথা ঘুরানো 
  • ঘাম এবং ঠাণ্ডা

উপরন্তু, রোগীদের মধ্যে কারও কারও কোষ্ঠকাঠিন্য এবং হালকা এসিডোসিস হতে পারে।

এই প্রতিক্রিয়াগুলো কমতে থাকে যখন ডায়েট অব্যাহত থাকে এবং শরীর নতুন ডায়েটের সাথে অভ্যস্থ হয়ে যায়।

রক্তের গঠনে পরিবর্তন

কিটো ডায়েট অনুসরণ করা ব্যক্তির রক্ত গঠনে অনেক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় কারণ, কম কার্ব গ্রহণ মোকাবেলা করতে শরীরের অভিযোজন পদ্ধতি।

বিশেষ করে, রক্তে লিপিড এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দেখা যায়।

৬০% এর বেশি রোগীর লিপিড মাত্রা বৃদ্ধি এবং ৩০% এর বেশী রোগীর কোলেস্টেরল উচ্চ মাত্রা পাওয়া যায়।

যদি এই পরিবর্তনগুলি গভীর হয় এবং শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছু উদ্বেগ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র রোগীর জন্য ডায়েটে সামান্য পরিবর্তন করা যেতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, স্যাচুরেটেড চর্বির পরিবর্তে পলিআনস্যাচুরেটেড চর্বি প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে, কিটোজেনিক অনুপাত হ্রাস এবং ডায়েটে চর্বির অনুপাত হ্রাস করে কার্বোহাইড্রেট এবং প্রোটিন অনুপাতের পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।

তবে এটা মূল কিটো ডায়েট নয়।

কিটো ডায়েট এর দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সমূহ

যখন কিটো ডায়েট দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত রাখা হয়, ব্যক্তির শরীরে এর দীর্ঘমেয়াদী খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।

কিডনির পাথর

সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, কিটো ডায়েট অনুসরণ করছে এমন ২০ জনের মধ্যে ১ জন কিডনি পাথরের সমস্যায় ভোগেন। কারণ লো কার্ব কিডনিতে পাথরের জন্য অনেকটাই দায়ী। এটা কিন্তু একজন সুস্থ্য মানুষের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। 

লিভারের অকার্যকারিতা

কিটো বা লো-কার্ব ডায়েটের ফলে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ সৃষ্টি হতে পারে। এর কারণ ফ্যাট ও প্রোটিনকে ভেঙ্গে গ্লুকোজ উৎপাদনের জন্য যকৃতের উপর প্রচুর চাপ পড়ে। যার ফলে উচ্চমাত্রার অ্যামোনিয়া উৎপন্ন হয়।

হাড় ভাঙ্গার ঝুঁকি বৃদ্ধি

কিটো ডায়েট এর ফলে ইনসুলিনের মত গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ মাত্রা পরিবর্তিত হয় এবং এসিডোসিসের প্রভাব উদ্ভূত হয়। এসিডোসিস হাড় ক্ষয়ে নেতৃত্ব দেয়। তাই, রোগীদের হাড় দুর্বল এবং হাড় ভাঙ্গার সম্ভাবনা দেখা যায়।

হার্টের সমস্যা

দীর্ঘদিন কিটো ডায়েট করার ফলে হার্টের নানা সমস্যা দেখা দেয়। এটি খুবই বিরল হলেও সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

এক্ষেত্রে হৃদপিণ্ডের পেশী আক্রান্ত হয় এবং সারা শরীরে রক্ত পাম্প করার ক্ষমতার উপর ও প্রভাব পড়ে।

মায়ার পুষ্টিবিদ মনীরা আক্তারের মতে-

ওজন কমানোর জন্য শর্টকাট উপায় বেছে না নিয়ে সময় নিয়ে শরীরচর্চা ও সঠিক ডায়েট অনুসরণ করুন। যেকোন ডায়েট অনুসরণের পূর্বে অবশ্যই ডায়েটিশিয়ানে পরামর্শ নিন। কারণ, ব্যক্তি ভেদে ডায়েট চার্ট ভিন্ন হতে পারে। এবং একজন ডায়টেশিয়ানই ঠিক করবেন কার জন্য কোন ডায়েট সঠিক।

আপনার ডায়েট সংক্রান্ত যেকোন প্রশ্নের উত্তর জানতে মায়া অ্যাপটি ইন্সটল করুন এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জেনে নিন।

Leave a Reply

Categories