মাল্টিটাস্কিং:উৎপাদনশীলতা এবং মস্তিষ্ককের উপর নেতিবাচক প্রভাব - মায়া

মাল্টিটাস্কিং:উৎপাদনশীলতা এবং মস্তিষ্ককের উপর নেতিবাচক প্রভাব

মাল্টিটাস্কিং আজকাল চাকরির বিজ্ঞাপনে কথাটা খুব চোখে পড়ে। যে কোন প্রতিষ্ঠান একজন তার কর্মী হিসেবে একজন মাল্টিটাস্কার কে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।চাকরির বিজ্ঞাপনে যে জব ডেসক্রিপশন থাকে তা একবার চোখ বুলাতেও আপনার কয়েক মিনিট সময় লাগতে পারে। কিন্তু, আসলেই কি একসাথে অনেকগুলো কাজ সফলভাবে করা সম্ভব? চলুন মাল্টিটাস্কিং সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই। 

মাল্টিটাস্কিং কি?

  • একযোগে দুটি বা আরও বেশি কার্য সম্পাদন করা
  • এক কাজ থেকে অন্য কাজে দ্রুত পরিবর্তন করা 
  • দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি কাজ সম্পাদন করা

সত্যিকার অর্থে মাল্টিটাস্কিং

  • খুব দ্রুত কাজের ফোকাস পরিবর্তন 
  • দ্রুত মনোযোগের পরিবর্তন 

আপাতদৃষ্টিতে মাল্টিটাস্কিং দেখে মনে হবে আপনি এক সাথে অনেক কাজ সম্পন্ন করছেন যা আপনার ও প্রতিষ্ঠানের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। কিন্তু,গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে আমাদের মস্তিস্ক একাধিক কার্য পরিচালনা করতে অতটা ভাল নয় যেমনটা আমরা ভাবি।

আপনি যখন এক কাজ থেকে অন্য কাজে মনোনিবেশ করবেন তখন-

  • আপনার মানসিক সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সমস্যা হবে
  • মেন্টাল ব্লক তৈরী হবে যা আদতে আপনার কাজের গতি কমিয়ে দিবে
  • একাধিক কাজের ক্ষেত্রে, যে কোন একটি কাজ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। (তথ্যসুত্র- আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন)

মাল্টিটাস্কিং উৎপাদনশীলতাকে কিভাবে প্রভাবিত করে? 

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে মাল্টিটাস্কিং একবারে একটি কাজ করার চেয়ে কম ফলপ্রসূ। এক কাজে মনযোগী ব্যাক্তির তুলনায় যেসব ব্যক্তি  নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইল নোটিফিকেশন ইত্যাদিতে মনযোগী থাকার পাশাপাশি কাজ করেন তারা-

  • সহজে একটি কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন না
  • তথ্য ভুলে যায় এবং পুনরায় মনে করেন
  • দ্রুত কাজ পরিবর্তন করেন

আমাদের মস্তিষ্ক একই সময়ে একাধিক কাজ সম্পাদন করেনা। ধারাবাহিকভাবে একের পর এক কাজ করে। আমরা মাল্টিটাস্কিং এর নামে এক কাজে থেকে দ্রুত অন্য কাজ করতে যাই। আমাদের ব্রেইন আগের কাজ থেকে পরের কাজে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে প্রায় এক থেকে দুই মিনিট সময় নেয়। এই সময়কে পরিবর্তন ব্যয় ( switching cost)  বলা হয়। 

এর পিছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হল-

মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আমাদের কাজে মনোযোগ দিতে সহায়তা করে।এর বাম এবং ডান উভয় দিক , অন্যান্য স্নায়বিক অঞ্চলের সাথে সমন্বয় করে কাজ সম্পন্ন করে। যখন কোনও একটি  কাজ করা হয়, তখন এর বাম এবং ডান উভয়দিকই যোগদান করে। কিন্তু, যখন মাল্টিটাস্কিংয়ের মুখোমুখি হয়, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের দুটি দিক একাধিক কাজ করার জন্য বাধ্য হয় বিভক্ত হয়ে কাজ করতে। (তথ্যসুত্র- সোসাইটি ফর নিউরোসায়েন্স)  

মাল্টিটাস্কিং এর ঝুঁকিসমূহ

  • মাল্টিটাস্কিং আপনার বুদ্ধিমত্তাকে কমিয়ে দিতে পারে। (তথ্যসুত্র- ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন)  
  • মস্তিস্কের ক্ষতি হতে পারে। 
  • উৎপাদনশীলতা কমে গিয়ে চাকরি হারাতে পারেন। 
  • ঝুঁকিপূর্ণ পেশা যেমন- স্বাস্থ্য, ড্রাইভিং, এভিয়েশন ইত্যাদি  খাতে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। 
  • বার বার বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে দ্রুত কাজ করতে গিয়ে মানসিক চাপ বেড়ে যেতে পারে। এটি ব্যাক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। (তথ্যসুত্র- ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইরভিন গবেষণা)

ব্যতিক্রম 

সব কাজে সমান মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।একটি খুব সহজ কাজের সাথে একটি কঠিন কাজ করা যেতেই পারে। 
আবার, ইউটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক গবেষণা করে দেখেছেন যে- ২০০ জন স্নাতক ছাত্রের মধ্য মাত্র ২.৫% ছাত্র মুঠোফোনে কথা বলার সাথে ভালোভাবে ড্রাইভিং করতে পারে। অর্থাৎ, কিছু কিছু ব্যাক্তি কঠিন একাধিক কাজ একসাথে করার ক্ষমতা রাখে। তবে গবেষকরা অণুমান করছেন যে জিনগত ভাবে এসব সুপারটাস্কারের ব্রেইন খুবই ব্যতিক্রম।

মাল্টিটাস্কিংয়ের নেতিবাচক ফলাফলগুলি হ্রাস করার উপায়

মাল্টিটাস্কিং এর নেতিবাচক প্রভাব গুলো স্থায়ী না অস্থায়ী সে বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। তবে এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো কমাতে মায়া এর বিশেষজ্ঞের মতে আপনি নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো অনুসরণ করতে পারেন- 

  • কাজেরচাপ যতই থাকুক না কেন একসাথে দুটির বেশি কাজ করতে যাবেন না
  • ২০-মিনিট নীতি অনুসরণ করুন। অর্থাৎ বারবার কাজ পরিবর্তন না করে যে কোন একটি কাজ পূর্ণ মনোযোগের সহিত ২০ মিনিট করুন।
  • কাজের সিডিউল করে রাখুন এক্ষেত্রে আপনি প্রযুক্তির সহায়তা নিতে পারেন। 
  • অফিসে অ্যাপ নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন সম্ভব হলে
  • কর্মপরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং গুছিয়ে রাখুন।  

মূলকথা হল, আপনার প্রয়োজনে আপনাকে যদি মাল্টিটাস্কার  হতে হয়ও তবে অবশ্যই সময়ের দিকে খেয়াল রাখবেন। সবকাজ একসাথে করতে যেয়ে সব একসাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। বরং, একটি কাজ মনোযোগ দিয়ে করে শেষ করে অপর কাজ করুন। এতে, আপনার উৎপাদনশীলতা বাড়বে বই কমবে না। মায়াতে প্রশ্ন করুন, এগিয়ে থাকুন।

Leave a Reply

Categories