বয়ঃসন্ধিকালে পরিবার থেকে প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদান করা কি জরুরী? - মায়া

বয়ঃসন্ধিকালে পরিবার থেকে প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদান করা কি জরুরী?

বয়ঃসন্ধিকালে প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনেকটা নিষিদ্ধ ভাবা হয়। পিতামাতারা এ বিষয়ে নিরব থাকতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করে থাকেন। বাংলাদেশে বিদেশী দাতাদের অর্থায়নে ২০১৪ সালে ৫ বছর মেয়াদী জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্পের মাধ্যমে চারটি জেলার তিনশো ৫০টি বিদ্যালয়ে,পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা বিষয়ক অধ্যায় জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বয়ঃসন্ধিকালে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক জ্ঞান দান করা হচ্ছে। বয়ঃসন্ধিকালে তারা শিখছে যৌনবাহিত নানা রোগ থেকে দূরে থাকার উপায়। মায়াতে ও আমরা এ সংক্রান্ত প্রশ্ন পেয়ে থাকি।

পরিবার থেকে কি বয়ঃসন্ধিকালীন প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন? 

এ বিষয়ে আলোচনার পূর্বে বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া প্রয়োজন। 

বয়ঃসন্ধিকাল কি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০ বছর এবং ১৯ বছর বয়সের মাঝামাঝি সময়টাকে কৈশোর বলে। এর যে কোন এ সময়ে বয়ঃসন্ধিকাল আসতে পারে। এটা মূলত কৈশোর ও যৌবনের মধ্যবর্তী পর্যায়।বয়ঃসন্ধিকাল ছেলে ও মেয়ে উভয়ের শরীর ও মনে নানা ধরণের পরিবর্তন ঘটে। 

বয়ঃসন্ধিকালের উপসর্গসমূহ

এ বয়সে মেয়েদের-

  • উচ্চতা বাড়ে
  • শরীরের বিভিন্ন অংশ স্ফীত হয়
  • বাহুমূল ও যৌনাঙ্গে লোম গজায়
  • মাসিক শুরু হয

এ বয়সে ছেলেদের-

  • দেহের উচ্চতা দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে
  • কাঁধ চওড়া হয়
  • গলার স্বর ভারি হয়ে আসে
  • পেশী সুগঠিত হয়
  • মুখে দাড়ি-গোঁফ ওঠে সেইসঙ্গে শরীরের নানা জায়গায় বিশেষ করে, বুকে, বাহুমূলে ও যৌনাঙ্গে লোম গজায়
  • অনেক সময়ে ঘুমের মধ্যে ছেলেদের বীর্যস্খলন হয়ে থাকে যা খুব স্বাভাবিক

বয়ঃসন্ধির এই সময়টা ছেলে মেয়ে উভয়ের প্রজনন ক্ষমতা বিকাশ হতে থাকে বলে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ হয়।

বয়ঃসন্ধিকালে প্রজনন শিক্ষা না পেলে কি হতে পারে ? 

আমাদের সমাজে একটি কুসংস্কার প্রচলিত আছে যে, যৌনতা এর মত জৈবিক ব্যাপারগুলো সন্তান এমনিতেই শিখে যাবে। আগ বাড়িয়ে জানানোর কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক জ্ঞানের অভাবে আপনার সন্তানের সাথে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। যেমন-

  • আপনি না বলে দিলেও সে ভুল তথ্য জেনে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে পারে
  • নিরাপদ স্পর্শ আর অনিরাপদ স্পর্শ এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারবে না
  • যৌন হয়রানির মত বিষয়গুলো সংকোচের কারণে বলতে না পেরে নিরবে সহ্য করতে পারে
  • আবেগের নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে
  • শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহননের মত বিপদ ঘটাতে পারে যেহেতু এ বয়সটা অত্যন্ত আবেগের
  • যৌন বাহিত রোগ বালাই এ আক্রান্ত হতে পারে

বয়ঃসন্ধিকালে প্রজনন শিক্ষা দেওয়ার গুরুত্ব

সঠিক সময়ে পরিবার থেকেই প্রথমে সন্তানদের প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা দেওয়াটা জরুরী। কারণ-   

  • এ বয়সে কিশোর কিশোরীরা অনেক বেশি কৌতূহলপ্রবণ এবং আবেগী হয়ে থাকে। বিশ্বায়নের এ যুগে যেকোন তথ্য সম্পর্কে চাইলেই জানা যায়। তবে, পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত সামাজিক প্রতিষ্ঠানের  থেকে বিষয়টি জানলে ভুল তথ্য জেনে বিপথগামী হবার সম্ভাবনা কমে যাবে। 
  • পরিবারের সদস্যদের সাথে নিঃসঙ্কোচে কথা বলার সুযোগ থাকলে এ সম্পর্কিত কোন প্রশ্ন কিশোর মনে আসলে তারা সহজেই জানতে পারবে ফলে নিজেরা সচেতন হবে।  
  • বীর্যস্খলন, মাসিক এর মত স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়াগুলো সম্পর্কে জানলে হঠাৎ করে এসব পরিবর্তনে তারা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত বোধ করবে না।
  • বয়ঃসন্ধিকালীন সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ ও যৌনরোগ সম্পর্কে জানা ও প্রতিরোধ করার জ্ঞান থাকলে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
  • সঠিক জ্ঞানের অভাবে এ বয়সীরা অনেক সময় নিকটাত্মীয় কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির শিকার হয় এবং পরিবারের কাছে তা প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করে।অনেকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সারাজীবন একটি ট্রমার মধ্যে দিয়ে পার করে। কিন্তু, পরিবারের  সদস্যরা যদি সঠিক সময়ে এ বিষয়ে তাদের অবহিত করে তবে তারা পরিবারের কাছে যৌন হয়রানির বিষয়গুলো গোপন করবে না। 

অন্যান্য কারণসমূহ

  • এ সময় বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করায় অনেকে ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনগুলো মেনে কিভাবে রোমান্টিক সম্পর্কগুলো বা নিজের অনুভুতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় সে সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের চেয়ে ভালো আর কেউ শেখাতে পারবে না। 
  • ছেলে মেয়েদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে রোমান্টিক সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে কোনটি স্বাস্থ্যসম্মত, কোনটি ক্ষতিকর, কোন স্পর্শ নিরাপদ আর কোনটি ক্ষতিকর সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিয়ে রাখলে বিপদে পড়লে সন্তান পরিবারকে জানাতে সংকোচ বা ভয় পাবে না। বিপদগ্রস্থ হলে কোথায় এবং কিভাবে সাহায্য নিতে হবে তাও জানিয়ে রাখা ভালো।

তাই, সংকোচ না করে বন্ধুর মত করে সন্তানদের সঠিকসময়ে প্রজনন শিক্ষা দিন। মনে রাখবেন,  কিশোর-কিশোরীরা আজ  যদি শ্রদ্ধা, স্বাস্থ্যসম্মত সম্পর্ক এবং কোনটি সঠিক বা কোনটি ভুল সম্পর্ক তা জানে তবে, তাদের ভবিষ্যতের সম্পর্কগুলো সঠিক ও সুন্দর হবে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে আরও কিছু জানার থাকলে মায়া অ্যাপটি ইন্সটল করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। আপনার পরিচয় এখানে গোপনই থাকবে।   

Leave a Reply

Categories