নারীদের অবৈতনিক কাজের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি - মায়া

নারীদের অবৈতনিক কাজের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি

নারীদের অবৈতনিক কাজের চাপ করোনাকালীন সময়ে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে । দীর্ঘদিন ঘরবন্দী থাকায় নারী,পুরুষ উভয়ের ই মানসিক চাপে রয়েছে কিন্তু লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে নারীদের শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয় প্রায়ক্ষেত্রেই। মায়ার প্লাটফর্মে এ সংক্রান্ত প্রচুর প্রশ্ন আমরা পাচ্ছি। এরকম একটি উদাহরণ নিম্নরূপ-

“ আমি একজন গৃহিণী। করোনা পরিস্থিতিতে আমার স্বামী এবং সন্তান ঘরে বসেই কাজ করছে। কিন্তু তাদের সারাদিন ঘরে থাকার ফলে আমার কাজের চাপ অনেক বেড়ে গিয়েছে। মানসিকভাবে আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। এমতাবস্থায় আমি কি করতে পারি?” 

মায়ার এক্সপার্টরা যথাসম্ভব নারীদের কাউন্সিলিং করে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।  

নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের চিত্র

করোনাকালীন সময়ের আগে নারীরা ঘরে পুরুষদের তুলনায় ৩.৪৩ গুণ অবৈতনিক শ্রম দিতেন (বিবিএস লিঙ্গ পরিসংখ্যান ২০১৮)। করোনায় যেহেতু স্কুল কলেজ বন্ধ, অনেক বাসায় পুরুষরাও ঘরে থেকে অফিসের কাজ করছেন সেহেতু ঘরে নারীদের অবৈতনিক শ্রম আরও বেড়ে গিয়েছে। চাকরীজীবি নারীদের ক্ষেত্রে এ কাজের ভার আরও বেশি। পোশাক শিল্প, দিন মজুরী, অন্যের বাসায় কাজ সহ অন্য অনেক ক্ষেত্রে নারীরা তাদের চাকরি হারিয়েছেন। ফলে, অর্থনৈতিকভাবেও তারা পিছিয়ে গিয়েছেন। অনেক পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামমুখী হচ্ছেন। অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক সার্বিকভাবেই নারীরা অবহেলার শিকার। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের এক গবেষণা বলছে, পুরুষতন্ত্রে প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে, নারী ঘরেই নিরাপদ। অথচ বাড়িতেই নারী বেশি সহিংসতার শিকার হন। ঘরের প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন নারীই নানাভাবে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নির্যাতিত হন। বিবাহিত নারীদের ৮২ শতাংশই স্বামীর হাতে কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মহামারীর প্রভাব

সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটিতে প্রতিদিন গড়ে ৫১টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। মানসিক টানাপোড়ন, বাধ্যতামূলক নৈকট্য, সর্বোপরি মানুষের মাঝে অসহিষ্ণুতা ও কাউকে ছাড় না দেওয়ার প্রবণতাই বিয়েবিচ্ছেদের কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।  ফলে, মানসিক ভাবে নারীরা অনেকটাই বিপর্যস্ত। পুষ্টিকর খাবার, যথাযথ চিকিৎসা পাবার অধিকার থেকেও তারা অনেকটাই বঞ্চিত। 

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাত এবং পোশাক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা অনেক। বাংলাদেশে ৯৪% নার্স এবং ৯০% কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ই নারী। বাংলাদেশে বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত মোট কারখানা দুই হাজার ২৭৪টি আর এই সব কারখানায় মোট শ্রমিক ২৪ লাখ ৭২ হাজার ৪১৭ জন যার একটি বড় অংশ নারী শ্রমিক। 

এমতাবস্থায়, মায়া এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সম্প্রতি কোভিড -১৯ এর বিস্তার রোধ ও সীমাবদ্ধ করতে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং তারা তৈরী পোশাকশিল্পের কর্মীদের মধ্যে সাধারণ স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে।

মায়া এক্সপার্টদের পরামর্শ 

মায়ার মেডিক্যাল এক্সপার্ট টিম লিড ডা. তানজিনা শারমিনের মতে-

“যেহেতু একজন নারী পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ন সদস্য, সেহেতু তাকে তার নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথা চিন্তা করতে হবে।নারীরা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেন কিন্তু নিজের অসুস্থতাকে অবহেলা করেন যা কাম্য নয়। কর্মজীবি বা গৃহিণী নারী, সকলেই সুস্থ থাকার জন্য সঠিক সময়ে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। যেকোন শারীরিক অসুস্থতায় অবহেলা না করে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন। এক্ষেত্রে, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও নারীর প্রতি যত্নশীল হন।”

মায়ার মনোসামাজিক বিশেষজ্ঞ শিমু আক্তারের মতে- 

একজন নারীর দৈনন্দিন কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় মানসিকভাবে রিলাক্স হতে না পারা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। নারীদের মানসিক চাপ কমাতে যা করতে পারেন-   

  • দায়িত্ব বন্টন করে দেওয়া ও অন্যের সহযোগিতা নেওয়া।  
  • পরিবারের সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাজে সমতা নিশ্চিত করা। তাহলে, কাজের পাশাপাশি মানসিক চাপ ও কমবে।   
  • সংকটাবস্থায় দুঃখ, মানসিক চাপ, বিভ্রান্তি, ভয় এবং রাগ অনুভব করা স্বাভাবিক।আপনার বিশ্বস্ত কারো সাথে কথা বলুন যে সহযোগিতা করতে পারে এবং যোগাযোগ রাখুন আপনার পরিবার এবং বন্ধু দের সাথে।
  • মেডিটেশনের মাধ্যমে শরীর ও মনকে শিথিল করে মানসিক ভাবে প্রাশান্তি পেতে পারেন।    
  • যদি আপনার খুব নেতিবাচক অনুভূত হয়, তাহলে স্বাস্থ্যকর্মী বা কাউন্সেলরের সাথে কথা বলুন।
  • পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নারীর কাজের প্রশংসা করুন এবং মানসিকভাবে সাপোর্ট দিন।
  • পরিকল্পনা করুন শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে কোথায় গেলে এবং কিভাবে সহযোগিতা পাওয়া যাবে । 

একজন নারী হিসেবে আপনি নিজের ও পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন হন। পুরুষরাও অনেকে মানসিক এবং আর্থিক ভাবে বিপর্যস্ত তবে এর দায়ভার পরিবারের নারীদের উপর চাপিয়ে না দিয়ে উভয়ের অংশগ্রহণমূলক প্রচেষ্টায় সমস্যার সমাধান করুন। প্রয়োজনে পরিচয় গোপন রেখে মায়ার এক্সপার্টের পরামর্শ নিন। মায়া আপনার পাশে রয়েছে সবসময়। এবারের নারী দিবসের উপাদ্যের মত আমরাও বলতে চায় –

“প্রজন্ম হোক সমতার,

সকল নারীর অধিকার।”  

তথ্যসুত্র,

https://reliefweb.int/sites/reliefweb.int/files/resources/RGA%20Bangladesh.Final_.May2020.pdf

Leave a Reply