একাকীত্ব: নতুন এক সামাজিক মহামারী মোকাবিলার উপায় - মায়া

একাকীত্ব: নতুন এক সামাজিক মহামারী মোকাবিলার উপায়

একাকীত্ব কি? কারা সত্যিকার অর্থে একা? একাকীত্ব কি স্বাস্থ্যের উপর কোন খারাপ প্রভাব ফেলে?  আমার বড্ড একা লাগে, মরে যেতে ইচ্ছা হয়। আমার করণীয় কি? 

মায়ার প্লাটফর্মে একাকীত্ব নিয়ে এ ধরনের নানারকম প্রশ্নের উত্তর আমাদের বিশেষজ্ঞরা দিয়ে থাকেন। কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সময়ে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোর পরিবর্তন হয়েছে। যখন, নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের সামাজিক দূরত্বের কোন বিকল্প নেই ঠিক তখনই, একাকীত্বের সামাজিক মহামারী তে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ছি।

একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতা কি?

নিঃসঙ্গতা এমন এক আবেগ যাকে একাকীত্ব গবেষক জন ক্যাসিওপপ্পোকে “সামাজিক ব্যথা” বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদের সাথে সংযোগের অভাবের কারণে আপনি যখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তখন আপনার একাকীত্বের অনুভূতি হয়।

এক্সজিস্টেনশিয়াল সাইকোলজিস্টের মতে, “মানুষ প্রকৃতপক্ষে একা। নিজেদের এই একাকীত্ব দূর করার জন্য আমরা অন্যের সাথে মিশি, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হই। ধীরে ধীরে নানা রকম প্রত্যাশা তৈরি হয় সে সম্পর্ক থেকে এবং সেই মানুষ গুলোকে কাছে না পেলে একা একা লাগে, ভিতরটা খালি খালি লাগে। মনে হয় কি যেন নাই যা স্বাভাবিক।”

একাকীত্ব সম্পর্কিত কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসা

কারা একাকীত্ব অনুভব করে?

একাকীত্বের অনুভুতি মোটামুটি সবাই কোন না কোন সময় অনুভব করে থাকে। কোন অভাববোধ পুরণের জন্য আমাদের শরীর ও মন কর্তৃক স্বাস্থ্যকর একটি সংকেত যা, আমরা অন্যের সহযোগিতা বা সংযোগে পূরণ করতে পারি তাই একাকীত্ব।

একাকীত্বতা কেন বেড়েছে?

পরিবার ছাড়া একা থাকা মানুষের হার বেড়ে যাওয়া, দেরিতে বিবাহ এবং সন্তান গ্রহণ শিক্ষা এবং ক্যারিয়ারের জন্য পরিবার ও বন্ধুবান্ধব থেকে দূরে সরে যাওয়া, বিবাহ বিচ্ছেদ, প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর হয়ে যাওয়া এসব নানা কারণে মানুষ  নিঃসঙ্গতার দিকে ধাবিত হতে পারে। 
কোভিড-১৯ মহামারী থেকে বাঁচতে আমরা যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছি এটিও অনেকের একাকীত্বের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।    

কেন নিঃসঙ্গতা অস্বাস্থ্যকর?

নিঃসঙ্গতা আপনার স্বাস্থ্যকে দুটি উপায়ে দুর্বল করে:
প্রথমত, জৈবিক প্রকৃতি অনুসারে,মানুষ সামাজিক জীব। নিঃসঙ্গতার সাথে সম্পর্কিত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের মধ্যে করটিসোল (স্ট্রেস হরমোন) স্তর বাড়ায়। দীর্ঘস্থায়ীভাবে কর্টিসল স্তরগুলি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলে তা শারীরিক, মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে। যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়, উদ্বেগ, হতাশা এবং ডিমেনশিয়া সহ আরও অনেক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। 
আসলে, দিনে ১৫ টি সিগারেট খেলে যেমন আপনার মৃত্যু ঝুঁকি ৫০% বেড়ে যায়,  তেমনই নিঃসঙ্গতা ও আপনার স্বাস্থ্যের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।   
দ্বিতীয়ত, প্রিয়জনের কাছে থাকা আমাদের স্ট্রেস হরমোনের স্তরকে হ্রাস করে। সামাজিকতা আমাদের যে কোন পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে এবং আনন্দের কারণ খুজে নিতে সহায়তা করে।
অন্যদিকে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলা করার জন্য মানুষ নানা অস্বাস্থ্যকর উপায় (উদা:-অতিরিক্ত খাওয়া, মদ্যপান, ধূমপান) বেছে নিতে পারে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক।  

একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতাকে হার মানানোর ১০ টি উপায়

  • সচেতন হন এবং আপনার অনুভুতি প্রকাশ ক্রুন: আপনার চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতি গুলো লিখে ফেলুন এবং আপনার সামাজিক অভিজ্ঞতার ফাঁকগুলি এবং নিজস্ব ভুলগুলি আবিষ্কার করার চেষ্টা করুন।
  • দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ক্রুন: আমাদের পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামো কীভাবে একাকিত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তা বিবেচনা করুন। দেরিতে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, কাজ এবং শিক্ষার জন্য ভৌগলিক অবস্থানের পরিবর্তনের মতো কারণে মানুষ  জীবনের অনেক সময় নিজেকে একা বোধ করে। বিশেষত বর্তমানে বাধ্যতামূলক সামাজিক দূরত্বের কারণে, আমরা যখন পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধব থেকে পৃথক আছি তখন একাকীত্ব বোধ করাটা স্বাভাবিক। নিজের প্রতি যত্নবান হন এবং জেনে রাখুন যে এতে আপনার নিজস্ব কোনও ভুল নেই।
  • কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সময়ে নিজের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটান: সৃজনশীল হন এবং দূরত্ব বজায় রেখেও কাজ করার নতুন নতুন উপায় শিখুন। প্রতিদিন সময় করে পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব কিংবা সহকর্মীদের সাথে বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্ম যেমন- ফেসবুক, স্কাইপ, ই-মেইল,  ম্যাসেজিং, এমনকি পুরনো দিনের মত চিঠি লিখে হলেও যোগাযোগ রাখুন। সেটি ছোট একটা গান, জোকস, পুরনো স্মৃতি যে কোন কিছু হতে পারে।  

একাকীত্বকে হার মানানোর অন্যান্য উপায়সমূহ

  • সম্পর্কগুলোকে অগ্রাধিকার দিন: নিঃসঙ্গতা কাটাতে সম্পর্ক তৈরী এবং বন্ধনগুলো মজবুত করার কোন বিকল্প নেই। ১০ মিনিটের জন্য প্রিয়জনের সাথে একটু কথা বলা আপনার সারাদিনের প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। এছাড়াও নিজের পছন্দের বিষয়গুলো  যেমন- বই পড়া, মুভি দেখা, গেম খেলা ইত্যাদি নিয়ে তৈরী বিভিন্ন গ্রুপে যোগ দিয়ে সময় কাটাতে পারেন। 
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন: রাতে পর্যাপ্ত ঘুম পরদিন আপনার একাকীত্ব অনুভব না করার এবং দিনটি উপভোগ করার  জন্য যথেষ্ট শক্তি যোগাবে। 
  • একান্ত সময়টুকু ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগান: ভালো থাকার জন্য সামাজিকতার যেমন প্রয়োজন রয়েছে তেমনি একান্ত নিজস্ব কিছু সময়েরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নিজের একান্ত মুহূর্ত গুলো সৃজনশীল কাজে ব্যয় করে উপভোগ্য করে তুলুন। ভবিষ্যতে মহামারী শেষ হলে কি করবেন, সম্পর্কগুলো কিভাবে নতুন করে মোহনীয় করে তুলবেন সে সম্পর্কে পরিকল্পনা করে রাখুন এখনই। কাজের দক্ষতা বাড়ানোর নানা উপায় শিখতে পারেন যা আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করতে সাহায্য করবে।
  • শিথিলায়নের চর্চা করুন: হালকা স্ট্রেচিং, মেডিটেশন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, যোগ ব্যায়াম,গান শোনার মত শরীর ও মনকে শিথিল করার অভ্যাসগুলোর চর্চা করুন নিয়মিত।     
  • ব্যায়াম: নিয়মিত ব্যায়াম আপনার শারীরিক, মানসিক এবং আবেগীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খুবই কার্যকর। এটি আপনার একাকীত্ব বোধ কমিয়ে আপনার মন ভালো রাখতে সহায়তা করে। 
  • প্রকৃতির সাথে কিছুক্ষণ: গবেষণায় বলছে যে, আমরা যত প্রকৃতির কাছাকাছি থাকব তত বেশি সুস্থ থাকব। এই মহামারীতে বাইরে যেতে না পারলেও আপনি বাগান করা বা নিজের বারান্দায় কিছু গাছ লাগানোর কাজে কিছু সময় ব্যয় করুন। দেখবেন, মনে অনেক প্রশান্তি পাবেন। 
  • কৃতজ্ঞ থাকুন: নিজের সম্পর্ক এবং পাওয়াগুলো নিয়ে খুশি থাকুন। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং নতুন সম্পর্ক তৈরির সম্ভাবনা তৈরী হবে। 

সবশেষে বলব, একান্ত প্রয়োজনে নিঃসঙ্কোচে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন। যখন, মায়ার মত ডিজিটাল প্লাটফর্মে ঘরে বসেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারছেন তখন, চিন্তা কি? শারিরীক স্বাস্থ্যের মত মানসিক স্বাস্থ্যকেও গুরুত্বসহকারে দেখুন।মায়া আপনার স্বাস্থ্য সেবায় পাশে রয়েছে সবসময়। অ্যাপটি ইন্সটল করুন, সচেতন থাকুন।     

Leave a Reply