কর্মজীবী মা ঘরে ও বাইরে যেভাবে মানসিক টানাপোড়ন কমাবেন - মায়া

কর্মজীবী মা ঘরে ও বাইরে যেভাবে মানসিক টানাপোড়ন কমাবেন

কর্মজীবী মা একসাথে অনেকগুলো ভুমিকায় কাজ করে থাকেন। কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সময়ে একজন কর্মজীবী মায়ের কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৬৬ শতাংশ মহিলা  কোভিড-১৯ চলাকালীন সময়ে মানসিক স্ট্রেস এর সম্মুখীন হয়েছেন। একজন কর্মজীবী মা প্রায়ই নানারকম মানসিক চাপের সম্মুখীন হন। যেমন- কর্মজীবী মা ভাবেন বাচ্চা কিংবা চাকরিতে তার সেরাটা হয়ত দিতে পারছেন না। এই নিয়ে অপরাধবোধে ভুগেন যে, সন্তানের জন্য, পরিবারের জন্য কিংবা নিজের জন্য তার সময়ের বড় অভাব।অনেকে হয়ত, চাকরি টা ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে ব্যক্তিত্ব সংকটে ভুগছেন। কর্মজীবী মা এ জাতীয় মানসিক টানাপোড়ন এর কারণে ক্যারিয়ার এবং সাংসারিক জীবনে পুরোপুরি মনযোগী হতে পারেন না। অনেক কর্মজীবী মা তাদের এ জাতীয় মানসিক সমস্যা নিয়ে মায়ার প্লাটফর্মে প্রশ্ন করে থাকেন।  

কর্মজীবী মা এর মানসিক টানাপোড়নের লক্ষণ 

মায়ার মনোসামাজিক বিশেষজ্ঞের মতে, অতিরিক্ত মানসিক স্ট্রেস আপনাকে শারিরিক ও মানসিক উভয়দিকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে।মানসিক টানাপোড়নের লক্ষণ গুলো হল- 

  • মানসিকভাবে আপনার আচরণের পরিবর্তন যেমন- ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত খাওয়া, দায়িত্বে অবহেলা 
  •  নিজেকে অপরাধী মনে হওয়া 
  • হতাশায় ডুবে যাওয়া
  • সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার অনুভুতি কিংবা নিয়ন্ত্রন গ্রহণ করতে হবে এমন অনুভুতি
  • অন্যদের এড়িয়ে চলা ইত্যাদি

মানসিক টানাপোড়নের ফলে শারিরীক যে লক্ষণ দেখা যায়- 

  • শারিরিক দুর্বলতা 
  • মাথা ব্যাথা 
  • হজমে  সমস্যা। যেমন- ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি 
  • বুকে ব্যাথা, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া 
  • ইনসমনিয়া 
  • শারীরিক সম্পর্কে অনীহা 
  • হাত, পা ঘামা, নার্ভাস হয়ে পড়া 
  • গলা শুকিয়ে যাওয়া, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া 

কর্মজীবী মা মানসিক স্ট্রেস কমাবেন কিভাবে?  

মানসিক টানাপোড়ন কিংবা স্ট্রেস আপনার জীবনের একটি অংশ। আপনাকে আপনার স্ট্রেস বেড়ে যাওয়ার লক্ষণগুলো জানতে হবে এবং প্রয়োজনে একজন মনোসামাজিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। নিজের জীবনযাত্রাতে কিছু পরিবর্তন এনেও সন্তান লালনপালন ও কাজের চাপ সংক্রান্ত বাড়তি মানসিক স্ট্রেসগুলো কমাতে পারেন। নিচের পরামর্শগুলো অনুসরণ করে দেখুন আপনার মানসিক শান্তি একটু হলেও ফিরে আসবে-

কর্মজীবী মা অন্য মায়েদের সাথে নিজের তুলনা করা বন্ধ করুন 

আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফিড হয়ত পারফেক্ট মায়েদের কাণ্ডকারখানা দিয়ে ভরপুর। এবং তাদের সাথে নিজের অবস্থানের তুলনা করে আপনি নিজেকে অপরাধী ভাবছেন। কিন্তু সত্যটা এই যে, সবাই তার জীবনের ভালো অংশগুলোই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরে। এর সেটা যদি নাও হয়ে থাকে তবুও আপনার মন খারাপের কিছু নেই। কারণ, আপনার এবং অন্যজনের সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আপনার জীবনযাত্রা, আয়, চিন্তাভাবনা, পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা একান্তই আপনার নিজস্ব এবং সে অনুযায়ী আপনি আপনার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাই, নিজেকে দোষারোপ না করে বরং পুরস্কৃত করুন। 

অনেকগুলো কাজ একসাথে না করে মনযোগ দিয়ে একটি কাজ শেষ করুন

কর্মজীবী মা চেষ্টা করুন গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মনযোগ সহকারে আগে শেষ করে ফেলার। অফিস থেকে ফিরে হয়ত আপনি দেখছেন সিংক ভর্তি থালাবাসন, এলোমেলো কাপড়চোপড়, বাচ্চার নাস্তার আবদার সহ আরও অনেক কাজ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। এখন, আপনি যদি প্রতিটি কাজের চাপ একসাথে মাথায় নিয়ে নেন স্ট্রেস অনুভব করাটা তখন স্বাভাবিক। তাই, যে কোন একটি কাজ দিয়ে শুরু করুন।

উন্নতির চেষ্টা করুন,পারফেকশনের নয়

“পারফেক্ট মা” বলে কিছু নেই। সব মা ই পারফেক্ট। আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী উন্নতির চেষ্টা করুন।পারফেক্ট করার রেস এ দৌড় না দিয়ে একটু একটু করে উন্নয়নের দিকে সচেষ্ট হন।যেমন- প্রতিদিন পুরো বাড়ি পরিষ্কার করার চেষ্টা না করে আপনার কাজের চাপ অনুযায়ী একটি করে রুম পরিষ্কার করুন। দেখবেন, এক সপ্তাহ পরে অনেকটাই আপনার বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন লাগছে।মনে রাখবেন হয়ত, প্রতিদিন পরিষ্কারের মত হবে না কিন্তু আপনার ত আরও অন্যান্য অনেক দায়িত্ব রয়েছে তাই না?

কর্মজীবী মা নির্দিষ্ট এবং অর্জন করার মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন

পারফেকশন অর্জনের রেসে অংশগ্রহণ করলে সারাজীবন নিজেকে শুধু দৌড়াতেই দেখবেন।সাধ্যের অতিরিক্ত লক্ষ্যের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে নিজের ঝুলিতে সাফল্যের পরিমাণ কমতে দেখাটা স্বাভাবিক। যদিও, স্বপ্ন বড় হওয়া দোষের কিছু নয়। সেই আগের উদাহরণটা দিয়েই আবার বলছি। ধরুন, আপনি ভাবছেন একদিনে আপনার পুরো বাড়ি ঝকঝকে করে ফেলবেন। ধরলাম, আপনি সারাদিন অফিস শেষে বাড়ি ফিরে তা করেও ফেললেন কিন্তু তার প্রভাব আপনার অন্য কাজের পারফরমেন্স এ পড়বে। আপনার যথেষ্ট বিশ্রাম হবে না। ফলে, আপনি অফিসের কাজে কিংবা সন্তানদের পড়ানোর কাজে মনযোগী হতে পারবেন না। তাই এমনভাবে লক্ষ্য সেট করুন “পুরো বাড়ি পরিষ্কার করব” এটা না করে “আজকে বাচ্চার রুম গোছাবো’, “কালকে সপ্তাহের পরিধেয় কাপড়গুলো আয়রণ করে ফেলব” কিংবা “পরেরদিন আগামী ২ দিনের রান্না করে রাখব”এমনভাবে করুন। এতে করে অন্যান্য ছোটখাট কাজের জন্য আপনি পরেরদিন অনেকটা সময় পাবেন।

কাজে শৃঙ্খলা ও কৌশল অবলম্বন করুন

একজন কর্মজীবী মা হিসেবে আপনাকে সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাজকর্মে শৃঙ্খলা আনতে হবে। সন্তানদের লালনপালনে কৌশলী হতে হবে যেন চাকরি এবং সংসার উভয়দিকে উইন/উইন পরিস্থিতি থাকে। প্রথমদিকে এটি অত্যন্ত কঠিন মনে হলেও সময়ের সাথে সাথে আপনি পারদর্শী হয়ে উঠবেন।

কজের রুটিন তৈরি করুন এবং নিজের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম বরাদ্দ রাখুন

রুটিন আপনার স্ট্রেস কমাতে কার্যকর ভুমিকা রাখে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য হয়ত সবকাজ আগে থেকে ধারণা করে শিডিউল করা সম্ভব নয় তবে, শিডিউল অনুযায়ী একই সময়ে একই জাতীয় অন্যকাজগুলো সেরে ফেলতে পারেন। এতে, দিনশেষে নিজের জন্য আপনি পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ পাবেন এবং পরবর্তী দিনের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন। 

নিজের জন্য একান্ত কিছু সময় রাখুন 

আপনি একজন মা বলে এই নয় যে, জীবনের প্রতিটি সময় আপনি সন্তানদের জন্য বরাদ্দ করে দিবেন। লাঞ্চ বিরতি কিংবা বাচ্চা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর নিজের জন্য একান্ত কিছু সময় বরাদ্দ করুন এবং নিজের ভালো লাগার কিছু করুন। এতে আপনার মানসিক স্ট্রেস কমবে এবং আপনি আরও ভালোভাবে আপনার সন্তানদের দেখভালে মনযোগী হতে পারবেন। 

দায়িত্ববন্টন

মনে রাখবেন অফিস কিংবা সংসারের সব দায়িত্ব আপনার একার নয়। তাই, সব দায়িত্ব  নিজের কাঁধে তুলে না নিয়ে অন্যদের সহযোগিতা নিন। কর্মজীবী মায়েরা নিজেদের সন্তানদের যথাসম্ভব স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলুন। এতে আপনার নিজের কষ্ট যেমন কমবে তেমনি, সন্তানরাও আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠবে।

সবশেষে বলব, সংসার, সন্তান ও অফিস এই তিনের মানসিক টানাপড়েন এ অনেক নারীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠে। কর্মজীবী মায়েদের জীবনযাত্রাটা নিঃসন্দেহে কঠিন। তাই, এসময় আপনার মানসিক হতাশা, স্ট্রেস, আবেগের উঠানামা এজাতীয় সমস্যাগুলো নিজের মাঝে পুষে না রেখে মায়ার মত প্লাটফর্মে মানসিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। নিজের যত্ন নিলে তবেই আপনি ভালভাবে অন্যদের যত্ন নিতে পারবেন। মনে রাখবেন, একজন মা সমসময়ই সেরা।       

Leave a Reply