পিসিওএস ( PCOS) রোগটি নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণার সঠিক ব্যাখ্যা - মায়া

পিসিওএস ( PCOS) রোগটি নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণার সঠিক ব্যাখ্যা

পলিসিস্টিক ওভারিয়ন সিন্ড্রোম (পিসিওএস)  হরমোনাল তারতম্য জনিত একটি অবস্থা যেখানে মহিলাদের মধ্যে এন্ড্রোজেন(পুরুষ হরমোন) হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে ঋতুস্রাব অনিয়মিত হয় কারণ মাসিকে ডিম্বস্ফোটন ঘটে না। 

আপনার যদি অনিয়ন্ত্রিত ওজন বা স্থুলতা, অনিয়মিত ঋতুচক্র, অবাঞ্ছিত লোম বা চুলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া সহ নানাবিধ মানসিক অসঙ্গতি যেমন- হতাশা, উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি দেখা যায় তবে দেরি বা অবহেলা না করে মায়াতে প্রশ্ন করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।        

পিসিওএস ( PCOS) এর কারণ 

ঠিক কি কারণে এ রোগ হয় তার কোন সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায় নি। তবে ব্যক্তি ভেদে এর কারণ ভিন্ন ভিন্ন হয় বলে ধারণা করা হয়। ধারণা করা হয়, জীনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ, আচরণ, জীবনযাত্রার ধরণ সব কিছুরই প্রভাব রয়েছে এতে। এর উপসর্গগুলো হালকা থেকে বেশি মাত্রায় থাকতে পারে। 

এই রোগ নিয়ে আমাদের মাঝে নানা ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। চলুন মায়ার ডাক্তারদের কাছে এর সঠিক ব্যাখ্যা জেনে নেই । 

ভুলধারণা সমূহ এবং সঠিক ব্যাখ্যা: 

যারা এই রোগে ভুগছেন তাদের সবারই পলিস্টিক ওভারি রয়েছে: না। প্রত্যেকেরই ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট সিস্ট থাকে না — সিস্ট এটির কারণ নয় বরং এটির লক্ষণ।

পিসিওএস সিস্টগুলি ডিম্বাশয়ের সিস্ট যেগুলো বেড়ে যায়, ফেটে যায় এবং ব্যথার কারণ হয় তার চেয়ে আলাদা ধরণের হয়। 

আমার ঋতুচক্র অনিয়মিত তাহলে আমারও PCOS রয়েছে: ঋতুচক্র অনিয়মিত হলেই যে আপনি এই রোগে ভুগছেন তা কিন্তু নয়। শারীরিক আরও নানা অসঙ্গতি কিংবা জীবনযাত্রার ধরণের কারণে আপনার ঋতুচক্র অনিয়মিত হতে পারে। যেমন- থায়রয়েড গ্রন্থির সমস্যা বা অন্যান্য কারন। 

এই রোগে আক্রান্ত নারীর বাচ্চা হবে না: সত্যটি হল তারাও গর্ভধারণ করতে পারে। তবে, মাসিক অনিয়মিত থাকার কারণে বাচ্চা নিতে চাওয়া ঐ সকল দম্পতির কোন সময়ে ডিম্বস্ফোটন হবে অর্থাৎ কোন সময়ে যৌন সম্পর্কে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেশি এসমস্ত বিষয় গুলো নির্ধারণ করা কিছুটা জটিল হতে পারে।

আমার  PCOS রয়েছে তাই আমার জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন নেই: আপনি যদি যৌন সম্পর্ক করেন এবং অনাকাংক্ষিত গর্ভধারণ এড়াতে চান তবে অবশ্যই আপনাকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। 

এ ব্যাধি কেবল ঔষধ সেবনেই ভালো হয়: না ধারণাটি ভুল। ঔষধের পাশাপাশি জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভাসের পরিবর্তন, ব্যায়াম, কিছু অভ্যাস ত্যাগ ও পরিবর্তন যেমন- ধূমপান ত্যাগ করা, খাবারে চিনি এবং কার্বো হাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে ফেলা ইত্যাদির মাধ্যমে PCOS নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। 

যেসব মহিলার শরীরে অবাঞ্ছিত লোম ও চুল বেশি তাদেরই PCOS রয়েছে: অতিরিক্ত অ্যানড্রোজেনের উপস্থিতির কারণে এ রোগে আক্রান্ত মহিলাদের শরীরে চুলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় যেমন- ঠোটের উপরে, বুকে, গালে ইত্যাদি জায়গায়। এটি PCOS এর একটি লক্ষণ মাত্র । PCOS ছাড়া অন্যান্য জিনগত কারণেও এমনটি হতে পারে।        

যদি আপনি গর্ভধারণে আগ্রহী না হয়ে থাকেন তবে এর চিকিৎসা বা এটি নিয়ে সচেতনতার প্রয়োজন নেই: PCOS একজন মহিলার শুধুমাত্র ফার্টালিটিতেই (উর্বরতা) প্রভাব ফেলে না, সারাজীবনের সুস্থতার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর সাথে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ,  কোলেস্টেরলের মাত্রার প্রভাব,অনিদ্রা, ডিপ্রেশন বা হতাশা, উদ্বিগ্নতা এমনকি এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সারেরও সম্পর্ক রয়েছে। তাই এটি নির্ণয় এবং চিকিৎসা খুব জরুরী।  

PCOS যাদের রয়েছে তারা সবাই স্থুলকায়: PCOS আছে মানেই সবাই ভেবে নেওয়া ঠিক না যে তিনি  স্থূলকায় হবেন। হ্যাঁ, যাদের এই রোগটি আছে তাদের মধ্যে স্থুলতার প্রবণতাটা একটু বেশি। তবে, চিকন যারা তাদের যে একেবারেই এই রোগ হবে না তার কোন গ্যারান্টি কিন্তু নেই। আবার অনিয়মিত পিরিয়ডের স্থূলকায় নারী মাত্রই তার PCOS রয়েছে এটি মনে করা একদমই :উচিৎ হবে না।  

এটি একটি বিরল রোগ: ২০১১ সালে বিএসএমএমইউ’র এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ থেকে পাঁচ শতাধিক রোগীর ওপর এক গবেষণা চালানো হয়েছে। এ গবেষণায়, প্রায় ৫০-৭০ শতাংশ নারীর মধ্যে এ সমস্যা পাওয়া গিয়েছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে দেখা যায়, সাধারণত, ১৫-২৫ বছর বয়সে যাকে রিপ্রোডাক্টিভ বয়স বলা হয় ৬-১০% মহিলার এই সমস্যা দেখা যায়। তাই বিরল রোগ ভেবে এটিকে অবহেলা করার কোন সুযোগ নেই। 

মায়ার ডাক্তার ডা. তানজিনা শারমিনের মতে  পিসিওএস (PCOS) নিয়ে ভুল ধারণাগুলো নারীদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তিনি বলেন- “ একটু সচেতনতা যেমন- ওজন ও উচ্চতার সমতা (বি এম আই) ঠিক রাখা, স্বাস্থ্য সম্মত এবং ব্যালেন্সড খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্থ হওয়া, খাবারে চিনি ও কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ব্যায়াম এর মাধ্যমে এই রোগটিকে আপনি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, পাশাপাশি অবশ্যই একজন ডাক্তারের শরনাপন্ন হবেন প্রয়োজনমত।”

Leave a Reply

Categories