করোনা চিকিৎসায় ডেক্সামেথাসন: কিছু তথ্য যা সবার জানা প্রয়োজন - মায়া

করোনা চিকিৎসায় ডেক্সামেথাসন: কিছু তথ্য যা সবার জানা প্রয়োজন

সম্প্রতি বিবিসিতে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ডের (RECOVERY বা Randomised Evaluation of COVid-19 therapy))  এক গবেষনায় দেখা গিয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ কোভিড-১৯ রোগীদের উপর ডেক্সামেথাসন নামের একটি ওষুধের ট্রায়ালে আশা ব্যঞ্জক ফল পাওয়া গিয়েছে। তবে এই স্টেরয়েডের ব্যবহার এবং এর সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলি সম্পর্কে আপনাদের জানিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরী। 

মূলকথা 

  • ডেক্সামেথাসোন, একটি সস্তা এবং সহজলভ্য  ঔষধ, কোভিড -১৯ এর গুরুতর জটিলতায় রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার হ্রাস করতে দেখা গেছে। 
  • স্টেরয়েড ১৯৬০ সাল থেকে রিউমাটয়েড আথ্রাইটিস এবং অ্যাজমার মতো বিভিন্ন রোগে গুরুতর পর্যায়ে, ক্যান্সারসহ বিশেষ কিছু রোগের চিকিৎসায় প্রদাহজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাসের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।  
  • ঔষধটি সম্পর্কে আরও জানতে বিস্তারিত পড়ুন। 

এই প্রাণঘাতী ভাইরাস জনিত রোগ মোকাবিলায় কোন ভ্যাক্সিন বা কার্যকরী কোন ঔষধ আবিষ্কারে গবেষকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি যেসব ঔষধ বর্তমানে বিভিন্ন রোগের উপশমে ব্যবহৃত হয়ে আসছে সেগুলোর প্রয়োগে কোভিড-১৯ এর  উপশম হয় কিনা তা নিয়েও গবেষকরা বিভিন্ন ট্রায়াল দিয়ে আসছিলেন। ডেক্সামেথাসন তেমনি একটি ট্রায়ালের সফল ফলাফল। কিন্তু এটি করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় মূল ওষুধ নয়। উপসর্গ বুঝে জটিলতা কমাতে ডাক্তারের পরামর্শে রোগীকে দিলে উপকার পাওয়া যায়। 

ডেক্সামেথাসোন কি?  

ডেক্সামেথাসন একটি স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ এবং এটি শরীরে প্রদাহনাশক হরমোনের উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়ে কাজ করে। এটি করোনার ক্ষেত্রে যেভাবে কাজ করে তা সহজ ভাষায় হলো, করোনা ভাইরাসের কারনে শরীরে যে জটিলতাগুলো তৈরি হয় সেগুলো কমাতে এটি সহায়তা করে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৭৭ সালে এই ঔষধদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে যদিও প্রায় ১৯৬০ সাল থেকে ক্যান্সার সহ বিশেষ কিছু রোগের চিকিৎসায় প্রদাহজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাসের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।  

কোভিড-১৯ প্রতিরোধে এটি কিভাবে কাজ করে?    

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রাপ্ত প্রাথমিক ফলাফলে জানা যায় যে, হাসপাতালে ভর্তি যেসব রোগীর ভেন্টিলেটর,কৃত্রিম অক্সিজেনের প্রয়োজন ছিল তাদের মধ্যে ডেক্সামেথাসন ওষুধ প্রয়োগে মৃত্যুর ঝুঁকির শতাংশ আগে থেকে কমেছে যা এই পরীক্ষার উল্লেখযোগ্য দিক। এ পরীক্ষায় নির্দিষ্ট সংখ্যক রোগী যারা হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে বা কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছিলেন তাদের ডেক্সামেথাসন দিয়ে এবং অনুরূপ সংখ্যক রোগীকে এই ঔষধ ছাড়া চিকিৎসা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায় যে, এই ঔষধ প্রয়োগকৃতদের মাঝে মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে।

তথ্য অনুসারে এর মাধ্যমে একজন করে করোনা রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব-

  • ভেন্টিলেটরে রয়েছেন এমন প্রতি ৩ জন রোগীর মধ্যে 
  • অক্সিজেন সাপোর্টে রয়েছেন এমন প্রতি ৫ জন রোগীর মধ্যে   

এই ঔষধ ট্যাবলেট বা ইঞ্জেকশন আকারে রোগীকে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। তারা এটিও জানিয়েছেন যে, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা ব্যতীত অন্যান্য কোভিড-১৯ রোগী যাদের উপসর্গ খুব হালকা তাদের ক্ষেত্রে এর কোন কার্যকরীতা পাওয়া যায় নি।   

ডেক্সামেথাসোনের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সমূহ 

ডেক্সামেথাসোনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশ কিছু ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে যেমন- ডোজ, সময়কাল এবং ফ্রিকোয়েন্সি ইত্যাদি। কারও কারও ক্ষেত্রে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হালকা থেকে মারাত্মক হতে পারে। সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে- 

  • ওজন বৃদ্ধি
  • উচ্চ্ রক্তচাপ
  • পেট খারাপ
  • মাথা ঘোরা
  • পটাসিয়াম হ্রাস
  • সিরাম গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি, বিশেষত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে
  • অনিদ্রা 
  • পেশীর দূর্বলতা
  • মাসিক পরিবর্তন 
  • কিডনী সমস্যা
  • হার্টের সমস্যা 
  • ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া 
  • মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন বা মুড সুইং 
  • বাচ্চাদের শরীরিক বৃদ্ধিতে বাঁধা 
  • ত্বকের একটি সহজে আঘাতের পাতলা করা
  • হতাশা, এমনকি মানসিক আচরণ
  • ত্বকের ক্ষতি 
  • হতাশা, উদ্বিগ্নতা এর মত মানসিক সমস্যা 

মায়ার ডা. তানজিনা শারমিনের মতে,- “ কোন ঔষধ ই ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত গ্রহণ করা উচিৎ নয়। এই ঔষধের ক্ষেত্রেও আমি বলবো ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত আপনারা নিজে নিজে এই ঔষধ সেবন থেকে বিরত থাকুন।এতে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনায় বেশি। আপনার কোন অ্যালার্জিক সমস্যা বা আগে থেকে কোন অসুখে ভুগে থাকলে তার বিস্তারিত তথ্য ডাক্তারকে বলুন। তারাই আপনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় সঠিক মাত্রায়, সঠিক ঔষধ গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারবেন, শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা হলে সেক্ষেত্রে অবশ্যই হাসপাতালে চিকিৎসা নিন, শারীরক অবস্থা বিবেচনা করে আপনার জন্য উপযুক্ত ওষুধ ডাক্তার দিয়ে থাকবেন। ”

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় প্রণীত জাতীয় নির্দেশিকায় এধরনের ওষুধ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটি করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় মূল ওষুধ নয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী শারীরিক জটিলতা কমাতে ডাক্তার প্রয়োজন বুঝে এটি রোগীকে দিয়ে থাকবেন। 

কোভিড- ১৯ চিকিৎসায় ডেক্সামেথাসোনের প্রয়োগ এবং মৃত্যুহার হ্রাস পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী গবেষণা ফলাফল। কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত এর যথেচ্ছ ব্যবহার আপনার বিপদের কারণ এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কোভিড- ১৯ সংক্রান্ত যেকোন বিষয়ে জানার জন্য মায়াতে প্রশ্ন করুন।      

Leave a Reply