আত্মহত্যার ঝুঁকি: আত্মহননের প্রবণতা সনাক্তকরণ এবং নিয়ন্ত্রণ - মায়া

আত্মহত্যার ঝুঁকি: আত্মহননের প্রবণতা সনাক্তকরণ এবং নিয়ন্ত্রণ

মূলকথা-

  • আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা, হতাশা এবং উদ্বেগের অনুভূতি সম্পর্কে কথা বলুন
  • আত্মহত্যার প্রবণতার লক্ষণগুলি সনাক্ত করুন
  • যদি আত্মহত্যা প্রবণতার লক্ষণ উপস্থিত থাকে তবে নিজের জন্য, আপনার বন্ধু বা আপনার পরিবারের সদস্যের জন্য সহায়তা নিন 

কারা ঝুঁকিতে রয়েছেন

কোভিড-১৯  মহামারী চলাকালীন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এমন কিছু মানুষ আত্মহত্যার জন্য উচ্চতর ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে। এর কারণ, অনেকে ই উচ্চ স্তরের মানসিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন ফলে হতাশা ও উদ্বেগেরর মত অনুভূতি দেখা দিতে পারে। আত্মঘাতী প্রবণতার  জন্য ইতিমধ্যে চিকিৎসা নিচ্ছেন এমন লোকদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।এ দলে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন তারাও যাদের মধ্যে আত্নহননের ইচ্ছা রয়েছে অথবা আত্নহত্যার চেষ্টাও করেছেন পূর্বে এমন ব্যক্তি। এছাড়াও অন্যান্য ব্যক্তিদেরও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে পারে। এদের মধ্যে রয়েছেন- পূর্বে থেকে মানসিক সমস্যা যেমন- হতাশা, উদ্বেগ এ ভুগছেন এমন মানুষ, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, নিজের নেগেটিভ চিন্তা ভাবনা  বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না এমন ব্যক্তি। এ সময়ে সবচেয়ে জরুরী হল নিজের প্রয়োজনের বা আবেগের কথাগুলো অন্যের সাথে শেয়ার করা এবং প্রয়োজনে সাহায্য গ্রহণ করা। চুপচাপ অনুভূতিগুলো নিজের মাঝে না রেখে নির্দ্বিধায় মায়ার মনোসামাজিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। 

সতর্কতার সংকেত   

আমরা সবাই যদি আত্মহত্যা প্রবণতার সতর্কতা লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানি তবে এ সময় আমরা অন্যকে মানসিক ভাবে সহায়তা করার পাশাপাশি সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে একটি জীবন বাঁচাতে ভুমিকা রাখতে পারি।  

কোনও ব্যক্তির আত্মঘাতী হতে পারে এমন উদ্বেগের কারণ অনুসন্ধানের কিছু লক্ষণীয় বিষয় হ’ল ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ নতুন আচরণের সুত্রপাত। নতুন বা পরিবর্তিত আচরণ যদি কোনও বেদনাদায়ক ঘটনা, ক্ষতি বা পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত হয় তবে এটি তীব্র উদ্বেগের বিষয়। বেশিরভাগ আত্মহননকারীরা তাদের বক্তব্য বা আচরণের মাধ্যমে এক বা একাধিক সতর্কতা সংকেত দিয়ে যান।

এখন প্রশ্ন হল কিভাবে বুঝবেন?

  • কথার মাধ্যমে সংকেত প্রদান- যদি কোন ব্যক্তি কথার মাধ্যমে নিম্নোক্ত ইশারা করে থাকেন- 
    • নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছা হয়
    • আশা হীন মনে হয়
    • বেঁচে থাকা অর্থহীন মনে হয়
    • অন্যের বোঝা মনে হওয়া 
    • নিজেকে বন্দী মনে হওয়া 
    • ব্যাথা সহ্য করার সক্ষমতা হারানো  
  • আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সংকেত প্রদান- নিচের কিছু আচরণগত পরিবর্তন বিশেষত যদি বেদনাদায়ক ঘটনা, ক্ষতি বা পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত হয়:
    • অ্যালকোহল বা ওষুধের সেবন বৃদ্ধি
    • জীবনকে শেষ করার উপায় খোঁজা যেমন পদ্ধতিগুলির জন্য অনলাইনে অনুসন্ধান করা
    • ক্রিয়াকলাপ থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা
    • পরিবার এবং বন্ধুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা 
    • খুব বেশি বা খুব কম ঘুমানো
    • লোকদের বিদায় জানানো বা ফোন করে বিদায় জানানো
    • মূল্যবান সম্পত্তি উপহার দেওয়া
    • আক্রমণাত্মক আচরণ 
    • অবসাদ
  • মেজাজ বা মুড এর পরিবর্তনের মাধ্যমে সংকেত প্রদান-  যে ব্যক্তিরা আত্মহত্যার বিষয়টি বিবেচনা করছেন তারা প্রায়শই নিম্নলিখিত এক বা একাধিক মেজাজ প্রদর্শন করেন:
    • বিষণ্ণতা
    • উদ্বেগ
    • আগ্রহ হ্রাস
    • খিটখিটেভাব
    • অপমান / লজ্জা
    • অতিরিক্ত রাগ
    • হঠাৎ করে খুব বেশি শান্ত বা রিলিফ অনুভব করা  

সংকেতগুলো উপস্থিত থাকলে আপনার করণীয়

আপনি যদি বর্তমানে কোন মানসিক বিশেষজ্ঞের চিকিৎসাধীন থেকে থাকেন তবে আপনার উপসর্গগুলো তাকে জানান। তিনি আপনার সাথে কথা বলে আপনার মানসিক অবস্থা এবং আপনার স্ট্রাগলগুলো বিবেচনায় নিয়ে আপনার বর্তমান রুটিনের কোন পরিবর্তন হবে কিনা কিংবা আপনার চিকিৎসার ধরনের কোন পরিবর্তন করতে হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন। 

যদি আপনি এখনও কোন কাউন্সিলরের শরণাপন্ন না হয়ে থাকেন তবে অবশ্যই আপনি দেরী না করে একজন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন। এক্ষেত্রে আপনি সহজেই মায়ার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। আপনি যখন কোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন সম্ভব হলে অবশ্যই আপনার পরিবারের কোন সদস্য, প্রিয়জন বা বন্ধুকে এ বিষয়ে অবগত করবেন। 

যদি সমস্যাটি আপনার নিজের না হয়ে থাকে কিন্তু আপনি আপনার কোন পরিচিত বা প্রিয়জনকে এরূপ সংকেত প্রদান করতে দেখছেন তবে এক্ষেত্রে মায়ার মনোসামাজিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হল- 

  • ঐ ব্যক্তির সাথে খোলাখুলিভাবে আপনার উদ্বেগের কথা বলুন। তাকে বোঝান আপনি বা তার পরিবার ও প্রিয়জন তার পাশে রয়েছেন এবং সে তাদের কাছে কতটা মুল্যবান।  
  • ব্যক্তির মানসিক কষ্টের কারণ এবং অবস্থা সম্পর্কে জানুন। তার কথাগুলো শুনুন। 
  • তাকে জিজ্ঞেস করুন সে আত্মহননের ব্যাপারে ভাবছে কিনা। 
  • সে উপযুক্ত সাহায্যকারী বা সাহায্যকারীর কাছে যেতেপারে এমন কারও কাছে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা এবং সহযোগিতা করা। চেষ্টা করা যেন তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখেন এবং একা সময়কে প্রোডাক্টিভ কাজে লাগিয়ে কিছু করেন। কারণ একা থাকলে আমাদের মাঝে নানা নেতিবাচক চিন্তা হতে পারে যা আত্নহননের জন্য উদ্দীপনা দেয় যাদের মাঝে পূর্বে থেকেই এ চিন্তা আছে। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। যাদের বেশিরভাগই নারী। নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট আত্মহত্যাকারীদের বেশিরভাগের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। বর্তমান মহামারীতে এই হার আরও বাড়ার আশংকা রয়েছে। তাই এখনই সময় শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হবার। খুলে বলুন মনের কথা মায়াতে।      

Leave a Reply