ঘরেই করোনা চিকিৎসা: নিজের এবং অন্যের যত্ন নেবার নিয়মাবলী - মায়া

ঘরেই করোনা চিকিৎসা: নিজের এবং অন্যের যত্ন নেবার নিয়মাবলী

বর্তমানে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেকেই হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারছেন না বা উপসর্গের তীব্রতা বুঝে যাচ্ছেন না, প্রাথমিক অবস্থায় বাড়িতে থাকছেন। সেই অর্থে কারো কারো বাসায় ই এখন কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগী রয়েছেন।  আপনি যদি (কোভিড -১৯) পজিটিভ হন এবং আপনি নিজেই বাড়িতে সেবা নিচ্ছেন বা আপনার ঘরে আপনার কোন প্রিয়জন (কোভিড -১৯) পজিটিভ এবং আপনি তার যত্ন নিচ্ছেন এমন পরিস্থিতিতে আপনার অনেক তথ্যই জানার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন- কখন বুঝবেন যে আপনার হাসপাতালে যাওয়া জরুরী বা আপনার ইমারজেন্সী সেবা প্রয়োজন? কতদিন আইসোলেশন প্রয়োজন? ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে আপনি কী করতে পারেন?

মায়া তে আমরা এ জাতীয় অনেক প্রশ্ন পেয়ে থাকি। মায়ার ডা. তানজিনা শারমিনের পরামর্শে এ সম্পর্কিত কিছু তথ্য আপনাদের জানিয়ে রাখছি-  

বাড়িতে চিকিৎসায় যেসব বিষয় জানা জরুরী

কোভিড-১৯ পজিটিভ এমন অনেকেই আছেন যাদের উপসর্গগুলো খুব স্বল্প পরিমাণে দেখা যায় এবং বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েই তারা সেরে  উঠতে পারেন। উপসর্গগুলো কয়েকদিন স্থায়ী থাকতে পারে এবং এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই  তিনি অনেকটা ভালো বোধ করতে পারেন। চিকিৎসার ভেতর রয়েছে প্রচুর তরল পান করা, বিশ্রাম এবং উপসর্গ অনুযায়ী ডাক্তারের পরামর্শে ঔষধ সেবন। এক্ষেত্রে মায়ার সাবস্ক্রিপশন প্যাক থেকে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিতে পারেন।  

নিজের এবং প্রিয়জনের আইসলেশনের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন। সম্ভব হলে চিকিৎসা সংক্রান্ত যে কোন প্রশ্ন ডাক্তারকে ফোন করে জেনে নিন (যেটা মায়াতে সম্ভব)। অসুস্থ ব্যক্তিকে তার নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য, ঔষধ এনে দিয়ে সহযোগিতা করুন তবে অবশ্যই নিজেকে নিরাপদ রেখে। 

এক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তার কথা মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরী কারণ একটু অসতর্কতায় আপনি নিজেও সংক্রমিত হতে পারেন। যারা আক্রান্তের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা অসুস্থ ব্যক্তি থেকে নিজেকে একেবারেই দূরে রাখুন এবং যাদের ঝুঁকি কম তাদেরকে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের জন্য নির্বাচন করুন। তবে সেখেত্রেও কোভিড-১৯ সাসপেক্টেড বা পজিটিভ রোগীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব ও উপযুক্ত প্রস্তুতি বা সতর্কতা মেনে তার সহায়তা করতে হবে।

জরুরী অবস্থা বোঝার উপায় 

নিজেকে অথবা যিনি আক্রান্ত হয়েছেন বা সাসপেক্টেড মনে করছেন তাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখুন, যেমন কোন ধরনের উপসর্গ খারাপের দিকে গেলে যেন সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। অবস্থা খারাপ বা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে জরুরী স্বাস্থ্য সেবা হটলাইন নাম্বার ৩৩৩ বা আই সি ডি ডি আর বি প্রদত্ত হটলাইন নাম্বারে ফোন করুন এবং সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পর্কে আগে থেকে ভালো ধারনা রাখুন। উপসর্গ তীব্র বিশেষ করে- 

  • শ্বাস কষ্ট হলে 
  • বুকে খুব ব্যাথা বা চাপ অনুভূত হলে 
  • নতুন কোন উপসর্গ খারাপভাবে দেখা দিলে বা শারীরিক অবস্থা আগে থেকে অবনতির দিকে গেলে
  • মুখ বা ঠোঁট নীলাভ দেখা গেলে
  • বাড়িতে অক্সিজেন স্যাচুরেশনের মাত্রা পরিমাপের সুযোগ থাকলে তা যদি স্বাভাবিক থেকে কমতে থাকে (সাধারনত এটি ৯৫ শতাংশ (SpO2 95%) এর নিচে গেলে স্বাভাবিক থেকে কম ধরা হয়, তবে এটি একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম স্বাভাবিক হতে পারে) 

নিজে অসুস্থ হলে যেভাবে অন্যদের নিরাপদে রাখবেন 

যদি আপনি করোনা পজিটিভ হয়ে থাকেন তবে নিম্নোক্ত নিয়ম মেনে আপনি নিজে পারেন ভাইরাসের সংক্রমণ বা বিস্তার ঠেকাতে- 

  • জরুরী স্বাস্থ্য সেবা নেয়ার প্রয়োজন ব্যতীত বাড়ীতে থাকুন। কাজে যোগদান, পাবলিক প্লেসে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। 
  • গণ পরিবহণ, রাইড শেয়ারিং সার্ভিস, ট্যাক্সি বা সি এন জি ইত্যাদি চড়া থেকে বিরত থাকুন। 
  • বাসায় একটি রুমে একা পরিবারের সবার থেকে আলাদা থাকুন। এমনকি খাওয়া দাওয়া ঘরেই করুন এবং আলাদা টয়লেট ব্যবহার করুন। ঘরের জানালা খোলা রেখে পর্যাপ্ত বায়ু প্রবাহের ব্যবস্থা রাখুন। নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের কিছু ব্যায়াম করতে পারেন(এর মধ্যে একটি হলো- একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসে লম্বা করে নাক দিয়ে শ্বাস ভিতরে টেনে নিবেন,তারপর ৫ সেকেন্ড ধরে রাখবেন যাতে আপনার কষ্ট না হয়,তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিবেন৷ এভাবে প্রতিবার ৫ মিনিট করে ৫/৭ বার দিনে করতে পারেন)
  • ঘরের যে জায়গাগুলো সবার যাতায়াত যেমন- রান্নাঘর সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। একান্তই সম্ভব না হলে অন্য ব্যক্তি থেকে ৬ ফিট দূরত্ব বজায় রেখে নিজের মুভমেন্ট সীমিত রেখে যথাযথ সতর্কতা মেনে কাজ সেরে দ্রুত প্রস্থান করুন। 
  • প্রতিদিন আপনার রুমের বার বার স্পর্শ করা স্থান যেমন- দরজার হাতল, মেঝে, সুইচ ইত্যাদি জীবাণুমুক্ত করুন। 
  • নিজের ব্যবহৃত তৈজসপত্র যেমন- থালা বাসন,বিছানা, ইলেক্ট্রনিকস ইত্যাদি  অন্যের সাথে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।এক্ষেত্রে একবার ব্যবহারযোগ্য থালা বাসন ব্যবহার করতে পারেন এবং ব্যবহারের পর তা মুখবন্ধ ডাস্টবিনে ফেলে দিন। 
  • অন্যের কাছাকাছি অবস্থায় সর্বদা মাস্ক পরিধান করুন, দূরত্ব বজায় রাখুন এবং প্রতিদিন মাস্ক পরিবর্তন করুন। 
  • মাস্ক পরা সম্ভব না হলে হাঁচি কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন, তবে আক্রান্ত ব্যক্তি মাস্ক ব্যবহার ছাড়া না থাকাই উচিত। 
  • সর্বোপরি কিছুক্ষণ পর পর সাবান পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত পরিষ্কার করুন অথবা অন্তত ৬০% অ্যালকোহল যুক্ত স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণু মুক্ত করুন।

কোভিড- ১৯ পজিটিভ রোগীর সেবাদানকারীর করণীয় 

কোভিড- ১৯ পজিটিভ রোগীর সেবাদান বা যত্ন নেওয়ার সময় সেবাদানকারীর করণীয় সম্পর্কে সি ডি সি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউ এইচ ও) এর পরামর্শগুলো বিশ্লেষন করে যা করনীয় হতে পারে তা নিম্নরূপ- 

  • বারবার হাত ধৌত করা এবং মুখের কোন অংশ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা- কিছুক্ষণ পর পর সাবান পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত পরিষ্কার করুন, বিশেষত রোগীর সেবা বা রুম থেকে বেরিয়ে, এছাড়া গ্লাভস ব্যবহার করুন। । সাবান না থাকলে অন্তত ৬০% অ্যালকোহল যুক্ত স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণু মুক্ত করুন এবং অবশ্যই নিজের নাক, মুখ এবং চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। 
  • ফেস মাস্ক পরিধান করুন- অসুস্থ ব্যক্তির ঘরে যদি আপনার প্রবেশের প্রয়োজন হয় তবে আপনি ফেস মাস্ক ব্যবহার করুন। অসুস্থ ব্যক্তির থেকে কমপক্ষে ৬ ফুট (২ মিটার) দূরে থাকুন। আপনি যখন আপনার মাস্কটি ব্যবহার করছেন তখন এটি স্পর্শ করবেন না। যদি আপনার মাস্কটি ভিজে বা নোংরা হয়ে যায় তবে এটি একটি পরিষ্কার, শুকনো মাস্ক দিয়ে প্রতিস্থাপন করুন। ব্যবহৃত মাস্কটি ফেলে দিন এবং আপনার হাত ধুয়ে ফেলুন।
  • ঘন ঘন ঘর পরিষ্কার করুন- ঘরবাড়ি ডিসইনফ্যাক্টান্ট করার উপযোগী ক্লিনার দিয়ে বার বার ঘরের মেঝে, দরজার হাতল এবং স্পর্শ করা পৃষ্ঠতলগুলো পরিষ্কার করুন। তবে, রোগীর রুম আপনি পরিষ্কার করা থেকে বিরত থাকুন। এমনকি রোগীর ব্যবহৃত থালাবাসন, বিছানা, বালিশ ইত্যাদিও। রোগী নিজে এগুলো করার মত সক্ষম না হলে এবং আপনার যদি করতেই হয় তবে হাতে গ্লাভস এবং মুখে মাস্ক পরে যথাসম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করে করতে হবে। 
  • জামাকাপড় ধৌত করা- রোগীর ব্যবহৃত জামাকাপড় গরম পানি ও ডিটারজেন্টে  ভিজিয়ে ধৌত এবং কড়া রোদে অথবা তাপে শুকাতে হবে। এক্ষেত্রে রোগী নিজে কাজটি করতে সক্ষম না হলে মাস্ক ও গ্লাভস পড়ে নিজের শরীর থেকে যথাসম্ভব দূরে রেখে অন্যজনকে পরিষ্কার করতে হবে। এবং কাজ শেষে সমস্ত কিছু জীবাণুমুক্ত করতে হবে এবং মাস্ক ও গ্লাভস টি ঢাকনাযুক্ত ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে হবে। এরপর অবশ্যই পূর্ব নির্দেশিত উপায়ে হাত ধৌত করতে হবে। 
  • ব্যবহৃত জিনিসপত্র ধৌত করার ক্ষেত্রে- রোগীর ব্যবহৃত তৈজস পত্র গরম পানি ও সাবান দিয়ে  পরিষ্কার করার সময় গ্লাভস পড়তে হবে। এরপর অবশ্যই পূর্ব নির্দেশিত উপায়ে হাত ধৌত করতে হবে ও গ্লাভস ফেলে দিতে হবে। রোগীর ব্যবহার করা জিনিসপত্র আলাদা রাখতে হবে। 
  • অসুস্থ ব্যক্তির শারীরিক তরলগুলি সরাসরি স্পর্শ করা এড়িয়ে চলুন- নাক মুখ এবং শ্বাসযন্ত্রের যত্ন প্রদানের সময় এবং মল, প্রস্রাব বা অন্যান্য বর্জ্য পরিস্কার করার সময় ডিসপোজেবল গ্লাভস এবং একটি ফেস মাস্ক পড়ুন। আপনার গ্লাভস এবং মাস্ক অপসারণ করার আগে এবং পরে আপনার হাত ধুয়ে নিন। আপনার মাস্ক বা গ্লাভস গুলি পুনরায় ব্যবহার করবেন না। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সব সতর্কতা পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। 
  • বাসায় মেহমান আসা বন্ধ রাখুন- অসুস্থ ব্যক্তি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠা এবং সব ধরনের উপসর্গ উপশম হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাড়িতে মেহমান বা দর্শনার্থী আসা বন্ধ রাখুন। এছাড়াও অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত যেকোন মহামারীতেই এড়িয়ে চলা জরুরি। 

আইসলেশনের সমাপ্তি  

 বাড়িতে আইসলেশন শেষ হবে কবে সে বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। এই বিষয়ে সি ডি সি প্রদত্ত নির্দেশনাবলী নিম্নরূপ- 

  • যদি আপনি নেগেটিভিটি টেস্ট করতে না পারেন-  টেস্ট করা যদি একান্তই সম্ভব না হয় তবে সে ক্ষেত্রে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবার পর তিন দিন কোন ধরনের জ্বর কমানোর ঔষধ ব্যতীত কোন জ্বর না আসলে, অন্যান্য উপসর্গ কমে গেলে এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার ১৪ দিন অতিক্রান্ত হলে। তবে সব সময়ে হাঁচি কাশির শিষ্টাচার মানা এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। 
  • যদি আপনি টেস্ট করেন- যদি কোন ধরনের জ্বর কমানোর ঔষধ ব্যতীত আপনার জ্বর না থাকে, অন্যান্য উপসর্গ ভাল হয়ে যায় এবং ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পর পর ২ টেস্টে আপনার সংক্রমণ রিপোর্ট নেগেটিভ আসে তখন। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউ এইচ ও) এটাও পরামর্শ দিয়েছে যে, সেবা দান কারী রোগীর উপসর্গগুলো শুরু হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ১৪ দিন নিজের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে রাখবেন। উপসর্গ গুরুতর না হলে ঘরে বসে যথাযথ নিয়ম মেনে ডাক্তারের চিকিৎসাতে অনেকেই রোগমুক্তি লাভ করেছেন।এই মহামারী মোকাবেলায় মায়া সবসময় আপনার পাশে রয়েছে। যে কোন প্রয়োজনে মায়ার সাবস্ক্রিপশন নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।নিজে সচেতন হন এবং অন্যকেও সচেতন হতে সহায়তা করুন।

Leave a Reply