মহামারীর ইতিহাস, বিজ্ঞানের আবিস্কার এবং আমাদের শিক্ষণীয় - মায়া

মহামারীর ইতিহাস, বিজ্ঞানের আবিস্কার এবং আমাদের শিক্ষণীয়

মানবসভ্যতার বহু আগ থেকেই মহাজগতে বিচরণ অণুজীবদের। এদের কেউ আমাদের জন্য উপকারী আবার কেউ কেউ দায়ী লাখ লাখ প্রানহানি সৃষ্টিকারী মহামারীর জন্য। এই অতিক্ষুদ্র অদৃশ্যমান ভাইরাস সৃষ্ট মহামারীতে ধবংস হয়েছে সভ্যতা, বদলে দিয়েছে সমাজ, সংগঠন, অর্থনীতি এবং সর্বোপরি আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। 

ভূতত্ত্ববিদ বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বলেছেন, ১০০ বছর পরপর প্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। যার ফলে, শতবর্ষ পরে পরেই পৃথিবীর ফিরে এসেছে মহামারীর প্রকোপ।বিশ্বের ইতিহাস অন্তত তেমন কথাই বলছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ২০১১-২০১৭ এই সাত বছরে বিশ্বব্যাপী ১৩০৭টি মহামারীর মতো ঘটনা ঘটছে। 

২৫০ খ্রিষ্টাব্দ : সাইপ্রিয়ান প্লেগ এবং ভাইরাসবিদ্যার সুত্রপাত 

সাইপ্রিয়ানের প্লেগ মহামারী বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এরপর পঞ্চম শতাব্দীতে এক দিকে যুদ্ধ, অপর দিকে মহামারী পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রথম ভাগে রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব অংশের সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ান সাম্রাজ্যকে প্রতাপশালী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, বুবোনিক মহামারীতে তার মৃত্যু সে সম্ভাবনাকে শেষ করে দেয়। পরবর্তী দুই শতাব্দীতে এ প্লেগে প্রায় ১০ কোটি মানুষ মারা যায়। এই ঘটনা ভাইরাস বিদ্যার সুত্রপাত্রের প্রয়োজনীয়তা প্রথম অনুভব করায়। মানুষ বুঝতে পারে যখন এই ভাইরাস কোন জনগোষ্ঠীতে প্রথম প্রবেশ করে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকে না তখন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।  

দ্যা ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭-১৩৫১  এবং বাড়ি থেকে কাজ করার প্রথা   

ধারণা করা হয়, জেনোস ব্যবসায়ীরা অবরোধের হাত থেকে বাঁচার পরে একজন মঙ্গোল জেনারেলের আক্রান্ত লাশকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে ইউরোপে প্লেগের সুত্রপাত করেছিল। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ২৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল, যা ইউরোপের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ ছিল। ক্ষুদ্রতর প্রাদুর্ভাব, যা বংশবৃদ্ধি দ্বারা ছড়িয়ে পড়েছিল, কয়েক শতাব্দী অবধি চলতে থাকে, এবং লোকজন বাড়ি থেকে কাজ করা শুরু করে যার মাধ্যমে আমরা কিছু যুগান্তকারী উদ্ভাবন পেয়ে যায়। যেমন: শেক্সপিয়র কবিতা লেখার জন্য ১৫৯০ সালে তার থিয়েটারগুলির একটি শাটডাউন করেছিলেন এবং ১৬৬৫ সালে এই মহামারীর কারণে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তার ছাত্রদের (স্যার আইজাক নিউটন সহ) বাড়ি পাঠিয়ে দেয় এবং এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিউটন আপেল গাছের নিচে বসে পদার্থবিদ্যার সুত্র আবিস্কার করে ফেলেন। আপনি এই সপ্তাহে কি অর্জন করেছেন বা শিখেছেন ?

প্রথম ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী: ১৫৮০ এবং কোয়ারেন্টাইন  

৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পেলোপনেসীয় যুদ্ধে  গ্রীক সৈন্যদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা দেখা গেলেও প্রথম এটি মহামারী রুপে দেখা দেয় ১৫৮০ সালে এশিয়াতে গ্রীষ্মকালে এবং তা দ্রুত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য পথে ছড়িয়ে পড়ে। পুরো মৃত্যুর সংখ্যা অজানা, তবে কেবল রোমে কমপক্ষে ৮০০০ মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। এই সময় ইউরোপ বর্ডারে ইমার্জেন্সী অথবা প্রাক কয়ারেন্টাইনের ধারণা পাওয়া যায়। 

বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে “ইনফ্লুয়েঞ্জা” এর প্রথম রেফারেন্সটি পাওয়া যায় ১৬৫০ সালে। 

১৮০০ সালের কলেরা মহামারী এবং ষড়যন্ত্র তত্ব  

উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে প্রায় ৬ বার বিভিন্ন জায়গায় কলেরার প্রকোপ দেখা যায়। ভারতের বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপত্তি হয়ে প্রায় ১০,০০০ প্রাণহানি ঘটিয়ে এটি উপনিবেশিক বাণিজ্য পথে অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ভ্রান্ত ধারনা, অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে এই ষড়যন্ত্র তত্ব ছড়িয়েছিল যে, নিম্নস্তরের মানুষদের মাঝে ইচ্ছাকৃতভাবে এই রোগ ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু গবেষকরা পরে আবিষ্কার করেন যে  এই প্রাদুর্ভাব কথিত এক পানির পাম্প থেকে নিঃসরিত দূষিত পানি পানের মাধ্যমে ছড়িয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে জন স্নো নামক একজন মহৎ ডাক্তার এই পানির পাম্প বন্ধ করেন যা দেশটির ইন্সটিটিউট অফ ট্রপিক্যাল ডিজিস সেন্টারে এখনও প্রদর্শিত আছে।  

স্প্যানিশ ফ্লু, ১৯১৮ এবং সামাজিক দূরত্ব  

সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ চিকিৎসা বিপর্যয়, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু বিশ্ব জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সংক্রমিত হয়েছিল এবং ৫০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। এই মহামারীতে প্রকাশ পেয়েছিল যে সামাজিক দূরত্বের দ্বারা কতটা জীবন বাঁচানো যেতে পারে। যেমন: যেসব শহরগুলি জনসমাগম  বাতিল করেছিল তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ খুব কম ঘটেছিল। মহামারীটি যখন শুরু হয়েছিল তখন,  ফিলাডেলফিয়া ২০০,০০০ লোককে জড় করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমর্থনে একটি কুচকাওয়াজ আয়োজন করেছিল; ঐ সপ্তাহের শেষ অবধি, ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। এদিকে, সেন্ট লুই জনসমাগম হয় এমন সব ভবন বন্ধ করে দিয়ে ট্রানজিট কমিয়ে দিয়েছিল ফলে সেখানে ফ্লু মৃত্যুর হার ছিল ফিলাডেলফিয়ার অর্ধেক। 

মধ্য শতাব্দীর ফ্লু মহামারী, ১৯৫৭ এবং ১৯৬৮ , ভ্যাকসিন আবিস্কার ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন 

মধ্য শতাব্দীতে ১৯১৮ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ জনগোষ্ঠী, অধিক বাণিজ্য সম্পর্ক ও বিমানভ্রমণের কারণে সংক্রামক ব্যাধি ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশ যেমন সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি এই সময়ে উল্লেখযোগ্য ভাবে ইমিউনোলজিবিদ্যার এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছিল।৩০ থেকে ৪০ এর মাঝামাঝি  ফ্লু ভ্যাকসিন আবিস্কার হয়েছিল এবং বর্তমানে যেসব স্বীকৃত জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো স্বাস্থ্যখাতে অগ্রণী ভুমিকা রেখে চলেছে যেমন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) , সেন্টারস ফর ডিজিস কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (CDC) তা ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবুও, দুটি পৃথক ফ্লু মহামারী (উভয়ই এভিয়ান ফ্লু থেকে এবং হংকং ও মূল ভূখণ্ড চীন থেকে উদ্ভূত হয়েছিল ) এর ফলে প্রতিটি ঘটনায় প্রায় এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল।   

এইচআইভি / এইডস, ১৯৭০ – বর্তমান এবং সামাজিক অবক্ষয় 

১৯৭০ এর দশক থেকে, প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মানুষ এইচআইভিতে সংক্রমিত হয়েছে এবং ৩২ মিলিয়ন পর্যন্ত মারা গিয়েছে। যদিও মহামারীটি প্রতিরোধে এন্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধগুলির কার্যকারিতায় গুরুতর অগ্রগতি এসেছে এবং ব্যবহৃত সুচ এক্সচেঞ্জ এর ব্যাপারে সতর্কতা এবং কনডমের ব্যাপক ব্যবহারের মতো জনস্বাস্থ্য কর্মসূচীগুলো এর প্রকোপ কমিয়ে এনেছে। তবে এটি আমাদের শিখিয়েছে সামাজিক অবক্ষয় আমাদের জীবনে কতটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।  

বর্তমান মহামারী কোভিড-১৯ এ এপর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩,২৩০০০ জন মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিটি মহামারী আমাদেরকে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য কিছু না কিছু শিক্ষা দিয়েছে। আসুন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংশোধন করি। এই লড়াই এ মায়া আপনাদের পাশে রয়েছে সবসময়। মায়াতে প্রশ্ন করুন, সচেতন ও সুস্থ থাকুন।   

Leave a Reply