নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কি আদৌ সম্ভব?

  • মুখমণ্ডল স্পর্শ করা আপনার ফ্লু আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়।  
  • আপনার চোখ ও মুখ দিয়ে খুব সহজেই ভাইরাস আপনার শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
  • গবেষণার পাওয়া গিয়েছে একজন প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১৬ বার তার মুখ স্পর্শ করে। 
  • আমরা যতবার মুখে হাত দেই ততবার হাত ধুই না। 
  • বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্লাভস পরা আপনাকে আপনার মুখমণ্ডল প্রায়শই স্পর্শ করার অভ্যাসটি ভাঙ্গতে সহায়তা করতে পারে।  

আমরা সবাই হাত দিয়ে মুখমণ্ডল স্পর্শ করে থাকি। আমরা প্রতিদিন অসংখ্যবার ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে আমাদের মুখমণ্ডল স্পর্শ করে থাকি। কখনও নাক চুলকানো, কখনো ক্লান্ত চোখ ডলে কিছুটা চাঙ্গা করতে,হাত দিয়ে মুখ মুছি এমন অনেক কিছুই আমরা দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে করি। কিন্তু এখন সময় এসেছে এসব ছোট ছোট বদভ্যাস যেটা কিনা করোনা ভাইরাসের কারণে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা পরিবর্তনের।    

আপনার চোখ ও মুখ এমন একটি সংবেদনশীল জায়গা যার মাধ্যমে সহজেই ভাইরাস আপনার শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং এই সংক্রমণের জন্য আপনার সংক্রমিত হাতের একটি স্পর্শ ই যথেষ্ট।  

যেভাবে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়: নভেল করোনা ভাইরাস কোন বায়ুবাহিত রোগ নয়। এটি সংক্রমণের ২ টি প্রধান উপায় হল –

  • সংক্রমিত ব্যাক্তির হাঁচি- কাশি ইত্যাদি থেকে যে ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় তা যদি কেউ শ্বাস- প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে তবে ওই ব্যাক্তি সংক্রমিত হবে। সংক্রমিত ব্যাক্তি থেকে দূরে থেকে অথবা সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করে আপনি বাতাসের মাধ্যমে এই ধরনের সংক্রমণ ঠেকাতে পারেন। 
  • কিন্তু বিভিন্ন সংক্রমিত জায়গা থেকে এই ভাইরাস আপনার হাতের সংস্পর্শের মাধ্যমে নাক, চোখ দিয়ে আপনার শরীরে প্রবেশ করতে পারে যা ঠেকানো আসলেও অনেক কঠিন।   

আমরা যেভাবে আমাদের মুখ স্পর্শ করি: ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ জন ছাত্রের মধ্যে সংগঠিত একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, তারা ঘণ্টায় ২৩ বার মুখ স্পর্শ করেছে এবং স্পর্শের জায়গা ছিল তাদের মুখ, নাক ও চোখ যা দিয়ে সহজেই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে। 

এমনকি আরেক গবেষণায় মেডিকেল প্রফেসর যাদের এই বিষয়ে পূর্বেই সচেতন তারাও হাত পরিষ্কার ব্যতীত ২ ঘণ্টার মধ্যে ১৯ বার তাদের মূখ স্পর্শ  করেছেন।     

মূলত, মানুষ যখন কাজে ব্যস্ত থাকে তখন অজান্তেই তারা নিজের হাত দিয়ে চোখ স্পর্শ করা, নিজের চুল ঠিক করতে যেয়ে, মিটিঙে বা সৌজন্য সাক্ষাতের সময় হাত মিলিয়ে থাকে এবং এরপর এরপর সেই হাত না ধুয়ে ই মুখ স্পর্শ করে থাকেন। 

হাত ধোয়া ই মুল সমাধান: এসব সংক্রমণ ঠেকানোর মূল উপায় হল বারবার সাবান পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় ধরে হাত ধোয়া। কিন্তু আপনার এই এত প্রচেষ্টা, এত সচেতনতা তখন, শুধুমাত্র তখনই, কাজে লাগবে যখন আপনি হাত দিয়ে মুখ স্পর্শ করার অভ্যাস ত্যাগ করবেন কারণ কেউ জানে না এত সাবধানতার পরেও আপনি কখন আপনার হাত দিয়ে কোন সংক্রমিত জায়গা স্পর্শ করেছেন এবং তারপর আপনার মুখ স্পর্শ করেছেন এবং নিজেই দাওয়াত দিয়ে ভাইরাস কে আপনার শরীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছেন।

এমনকি একটি দরজার হাতল, লিফটের বাটন, অফিসের বায়মেট্রিক এটেন্ডেন্স মেশিনে ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়ার  মাধ্যমেও আপনার হাতে ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।    

 অভ্যাস পরিবর্তনের কিছু টিপস: চলুন জেনে নেই হাত দিয়ে মুখমণ্ডল স্পর্শ করার এই অভ্যাস পরিবর্তন করার কিছু টিপস –

  • আপনার সদিচ্ছা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখতে পারে।কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু বিরতি নিয়ে নিজের সঙ্কল্প গুলো একবার ঝালাই করে নিন। 
  • মোবাইলে রিমাইন্ডার, আপনার ওয়ার্ক স্টেশনে হ্যান্ড নোট টাঙ্গিয়ে রেখে নিজেকে স্মরণ করিয়ে  দিতে পারেন। 
  • সর্বদা আপনার হাতকে ব্যস্ত রাখুন। বিশেষ করে আপনি যখন টিভি দেখছেন, অথবা গান শুনছেন পাশাপাশি কোন কাজ করুন যেমন- কাপড় ভাজ করা,ইস্ত্রি করা অথবা হাত দিয়ে কোন কিছু ধরে রাখুন। 
  • সুগন্ধি যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার সাথে রাখুন যেন যখনই আপনি আপনার হাত মুখমণ্ডল স্পর্শ করতে যাবেন তখনই এর সুবাস আপনাকে আপনার সংকল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। 
  • যখন আপনি ক্লাসে,অথবা মিটিঙে  আপনি আপনার ২ হাত জড়ো করে কোলের উপর রাখুন। 
  • এছাড়াও আপনি জনসমাগম স্থলে গ্লাভস পরতে পারেন যেন হাতের গ্লাভস আপনাকে আপনার সংকল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়।বাইরে থেকে ফিরে অবশ্যই গ্লাভস খুলে ভাল ভাবে হাত ধুয়ে নিবেন। যদিও ভাইরাস প্রতিরোধে গ্লাভস খুব বেশি কার্যকরী না তবুও আপনাকে আপনার সংকল্প মনে করিয়ে দিতে এটি দারুন কাজ করতে পারে।    

মূলকথা হল, সংক্রমিত কোন কিছুর সংস্পর্শে আসা আপনার নিজের হাতই আপনার নাক, মুখ ও চোখের মাধ্যমে ভাইরাস আপনার দেহে প্রবেশ করতে সহায়তা করছে। আপনি সারাদিনে অসংখ্যবার হাত ধুয়েও এই বদভ্যাস পরিত্যাগ না করলে নিরাপদ থাকতে পারবেন না। তাই আসুন আমরা হাত দিয়ে মুখমণ্ডল স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকি। করোনা সংক্রান্ত যেকোন বিষয়ে প্রশ্ন করুন মায়াতে। সচেতন হন, সুস্থ থাকুন।    

Leave a Reply