সব দোষ কিংবা দায়িত্ব কি শুধু মায়ের?

মা শব্দটি যতটা মধুর একজন মায়ের দায়িত্ব ততটাই কঠিন। একজন মাকে সন্তান জন্মদানের পর সবচেয়ে বেশী যে প্রশ্নটি শুনতে হয় তা হল-

“আমরা কি বাচ্চা মানুষ করি নাই?’ আমাদের সমাজে একজন মহিলা গর্ভবতী হলে স্বভাবতই পরিবারের সবাই খুব খুশি হয় এবং নানাভাবে তার শারীরিক যত্ন নেওয়া শুরু করেন যেমন- বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার দাবার, উপহার সামগ্রী দেওয়া ইত্যাদি।ফলাফল হিসেবে অনাগত সন্তানের সু-স্বাস্থ্যের কথা ভেবে মায়েরা প্রায়ই প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়া দাওয়া করেন ও খুব স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত ওজন বাড়িয়ে ফেলেন। গর্ভাবস্থায় যেকোন সমস্যা সম্পর্কে জানতে মায়া অ্যাপ ইন্সটল করুন।

কিছুদিন পর যতই বাচ্চা প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে সবাই অনাগত বাচ্চার যত্ন আত্তি, তার জন্য উপহার সামগ্রী কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এদিকে গর্ভবতী মা তার বাড়ন্ত ওজন, শারীরিক পরিবর্তন, অনাগত সন্তান, প্রসব বেদনা এবং সন্তান প্রসবের পর শরীরের আকৃতি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন।    

একটি পরিবারে একটি নবজাতকের আগমনের যে চিত্রটি সাধারণত আমাদের মনের দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে তা হল নতুন শিশুটিকে ঘিরে বাবা-মা এবং অন্যান্য পরিজনের উচ্ছ্বাস। কিন্তু একজন মা যিনি ১০ মাস ১০ দিন গর্ভধারণ করে সন্তান টি পৃথিবীতে নিয়ে আসলেন তাকে ঘিরে কোন উচ্ছ্বাস কি দেখা যায়? বরং তাকে শুনতে হয় কেন বাচ্চা দুধ পাচ্ছে না? বেশী বেশী খাও। কেন বাচ্চা কান্নাকাটি করে? খেয়াল কর না? বাচ্চার এত শুকনা কেন? বাচ্চার কি পেট ভরে না? ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্ন। মায়ের মানসিক অবস্থা কি আমরা আদৌ বুঝতে চেষ্টা করি?       

এ সমস্ত কারণে অনেক মা মাতৃত্বের মত মহান পেশাটি কে উপভোগ করতে পারেন না। নিজের কথা একটুও না ভেবে বরং কিভাবে একজন সেরা মা হয়ে উঠা যায় তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। চিকিত্‍সা শাস্ত্র অনুযায়ী, সন্তান গর্ভাবস্থায় থাকাকালীন, মায়ের শরীরে নানারকম হরমোন এর অবস্থা স্বাভাবিক স্তরের চাইতে দশ গুণ বেড়ে যায় এবং সন্তান জন্মের অব্যবহিত পরেই এই হরমোনের স্থর অতি দ্রুত নেমে স্বাভাবিক স্তরে চলে আসে । হরমোনের এই পরিবর্তনের ফলে মাযের মানসিকতায় বিভিন্ন পরিবর্তন লক্ষ করা যায় এবং এই পরিবর্তনগুলি সাধারণত: সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই দূর হয়ে যায় । এইরকম পরিস্থিতিতে, একে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বলা যাবে না ।    

সন্তান জন্মদানজনিত শারিরিক ধকল, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং হরমোনের বিভিন্ন জানা-অজানা প্রভাবের কারণে মায়েরা একটু খিটখিটে আচরন করতে পারে, তুচ্ছ কারণে অভিমান বা কান্নাকাটি হতে পারে- এগুলোকে সাধারণত বেবি ব্লূস (Baby Blues)- বলা হয় যা সাধারণত শিশুর জন্মের এক-দেড় মাসের মধ্যে কেটে যায়।

তবে বিষয়টি আর ‘Baby blue’- র পর্যায়ে থাকে না যখন এসব সমস্যা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় যেমনঃ মা-কে ভয়াবহ আত্মগ্লানি এবং বিষণ্ণতা গ্রাস করে এবং বিষয়গুলো দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে কিংবা সময়ের সাথে বাড়তে থাকে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলোকে মায়ের আচরণজনিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বিষয়টি মূলত সন্তান জন্মদান-জনিত বিভিন্ন জটিলতার প্রভাবে ঘটে। এক্ষেত্রে পরিবার পরিজন ই পাশে থেকে তার মানসিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারেন। সন্তানের দায়িত্বগুলো পরিবারের সবাই ভাগাভাগি করে নিয়ে মাকে কিছুটা বিশ্রাম দিতে পারেন এবং তার তাকে তার নিজের মত করে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ দিতে পারেন।মাকে তার ভাল লাগার কাজগুলো যেমন-বাগান করা,গান শোনা, প্রার্থনা করা, ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি করার সুযোগ করে দিতে হবে।

স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি আর একটু বেশী মনযোগী হতে পারেন। পরিবারের সদস্যরা মাকে কোন দোষারোপ না করে তার প্রয়োজন, ইচ্ছাগুলোর দিকে খেয়াল করুন। সন্তান সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলো মায়ের পরামর্শ নিয়ে করুন।কারণ আপনাদের সামাজিক প্রক্ষাপট আর বর্তমান সামাজিক প্রক্ষাপট এক নাও হতে পারে। তাই সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে না দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণ করুন। প্রাকৃতিকভাবেই ‘মা’ তার শিশুর সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী, তাই মায়ের জন্য প্রতিকূল বিষয়গুলোর শিকার হতে পারে নবজাতক শিশুটিও।       

এসব বিষয়গুলো নতুন এবং হবু বাবা-মায়েদের যেমন জানা দরকার তেমনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও সচেতনতা জরুরী।  যাতে করে প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন এর যেকোনো ধরণের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে কন্সাল্ট্যান্টের সাথে যোগাযোগ করা যায়। একজন সুস্থ মা ই উপহার দিতে পারেন একটি সুস্থ জাতি। আসুন সবাই মিলে একজন মা কে তার মাতৃত্বকে জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হিসেবে উপভোগ করার সুযোগ করে দেই।      

Leave a Reply