জরায়ু মুখের ক্যান্সারের কারন

প্রায় সব ক্ষেত্রেই হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাস (human papilloma virus) এর কারনে জরায়ু মুখের কোষের ডিএনএ (DNA) এর গঠন বদলে যাওয়ার মাধ্যমে এই ক্যান্সার হয়ে থাকে।
সব ক্যান্সারই শুরু হয় কোষের ডিএনএ (DNA) এর গঠন বদলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। কোষের যাবতীয় তথ্য তার ডিএনএ (DNA) এর ভিতরে থাকে, কোষ কিভাবে বৃদ্ধি পাবে, কোষের সংখ্যা কি হারে বৃদ্ধি পাবে – সব তথ্যই ডিএনএ (DNA) এর ভিতরে থাকে।
ডিএনএ (DNA) এর গঠন বদলে যাওয়ার এই ব্যপারটিকে মিউটেশন (mutation) বলা হয়। এর ফলে কোষ কিভাবে বৃদ্ধি পাবে, ডিএনএ (DNA) এর সেই নির্দেশনাটি বদলে যায়। কোষ বিভাজনের মাধ্যমে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, স্বাভাবিক নিয়মে একটা পর্যায়ে এই কোষ বিভাজন থেমে যায়। কিন্তু নির্দেশনা বদলে যাওয়ার কারনে কোষ বিভাজন অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে থাকে। কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারনে আক্রান্ত স্থানটি চাকার মত ফুলে উঠে, যাকে টিউমার বলা হয়।

  • হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাস (human papilloma virus)

গবেষণায় দেখা যায়, জরায়ু মুখের ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ৯৯ জনই ইতিপূর্বে হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিল। হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসের ১০০ এর উপর প্রজাতি রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক গুলোই কোন ক্ষতি করে না। অল্প কিছু প্রজাতি জরায়ু মুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী।
যৌনমিলনের মাধ্যমে মেয়েরা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, খুব সহজেই এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। হিসাব মতে, নিয়মিত যৌন জীবন শুরু করেছে এমন মেয়েদের মধ্যে প্রতি ৩ জনের ১ জন দুই বৎসরের মধ্যে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়, এবং প্রতি ৫ জনে ৪ জন তার সমগ্র জীবনে কোন না কোন সময়ে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়।
হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসের কিছু প্রজাতি কোন ক্ষতি করে না, লক্ষণও থাকে না, চিকিৎসা ছাড়াই নিজে নিজে ভাল হয়ে যায়। কোন কোন প্রজাতি জেনিটাল ওয়ার্ট (genital warts) এর জন্য দায়ী। তবে, এর কোনটিই জরায়ু মুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী নয়।
প্রায় ১৫ প্রজাতির হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাস জরায়ু মুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী। তাদের মধ্যে দুটি প্রজাতি সবচেয়ে বিপদজনক, সে দুইটি হলো, HPV-16 এবং HPV-18। প্রতি ১০টি জরায়ু মুখের ক্যান্সারের মধ্যে ৭টিই এই দুই প্রজাতির সংক্রমনের কারনে হয়ে থাকে।
ধারনা করা হয়, হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসের এই দুই বিপদজনক প্রজাতির মধ্যে মানুষের জিনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কিছু উপাদান রয়েছে। এই বিশেষ উপাদান জরায়ু মুখের কোষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান করে, ফলে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজনের কারনে ক্যান্সার টিউমারের সৃষ্টি হয়।

  • জরায়ু মুখের আস্তরনের নিউপ্লেসিয়া (Cervical intraepithelial neoplasia – CIN)

সাধারনত জরায়ু মুখের ক্যান্সার হতে বেশ কয়েক বৎসর সময় লাগে। প্রাথমিক পর্যায়ে যেটা হয় তা হলো, জরায়ু মুখের আস্তরনের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, যাকে Cervical intraepithelial neoplasia বা সংক্ষেপে CIN বলা হয়ে থাকে । এটা হলো ক্যান্সার পূর্ববর্তী অবস্থা (pre-cancerous conditions)। এই অবস্থা তাৎক্ষনিক ভাবে শরীরের কোন ক্ষতি করে না, কিন্তু দীর্ঘদিন এই অবস্থা থাকলে তা কান্সারে পরিনত হতে পারে।
আপনার যদি জরায়ু মুখে এই নিউপ্লেসিয়া হয়েও থাকে, নিয়মিত স্ক্রিনিং পরীক্ষায় যদি তা সনাক্ত হয়ে যায়, তবে আপনার ক্যান্সার হবার সম্ভবনা খুবই কম। এ পর্যায়ে চিকিৎসায় খুবই ভাল ফল পাওয়া যায়।
হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া, সেখান থেকে জরায়ু মুখে নিউপ্লেসিয়া হওয়া এবং তার থেকে ক্যান্সার হওয়া – এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, সাধারনত ১০ থেকে ২০ বৎসর সময় লেগে যায়।

  • যাদের ঝুকি বেশি

যদিও হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসের বিস্তার ব্যাপক হারেই হয়ে থাকে, কিন্তু এই ভাইরাসে সংক্রমিতদের মধ্যে জরায়ু মুখে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামুলকভাবে অনেক কম। ভাইরাস সংক্রমনের পাশাপাশি আরো কিছু ঝুকি রয়েছে যা জরায়ু মুখে ক্যান্সারের সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়। সেই ঝুকিগুলো হলো –

  • ধুমপানঃ যে সকল মেয়েরা ধূমপান করে তাদের জরায়ু মুখে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভবনা যারা ধূমপান করেনা তাদের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি।
  • দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি বা যাদেরকে এমন ওষুধ খেতে হয় যে ওষুধ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রাখে, তাদের ঝুকি বেশি। উদাহারন হিসাবে বলা যায়, যাদের কিডনি বা অন্য কোন অঙ্গ প্রতিস্থাপিত হয়েছে, সেই অঙ্গটিকে শরীর যেন প্রত্যাখ্যান না করে সেই প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রাখা হয়।
  • ৫ বৎসরের বেশি সময় ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি খেলেঃ দেখা গেছে যারা ৫ বৎসরের বেশি সময় ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি খেয়েছে তাদের ঝুকি, যারা কখনো জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি খায়নি তাদের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি। যদিও এর কোন কারন এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।
  • অধিক সন্তান হলেঃ দেখা গেছে যাদের কোন সন্তান হয়নি, তাদের তুলনায় যাদের দুইটি সন্তান হয়েছে তাদের ঝুকি দ্বিগুণ বেশি। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারন জানা যায়নি, তবে ধারনা করা হয়, অধিক সন্তান হলে বারবার শরীরে গর্ভাবস্থা জনিত হরমোনের যে পরিবর্তন হয় তা জরায়ু মুখে হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাবের সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

জরায়ু মুখের ক্যান্সারের বিস্তার
জরায়ু মুখের ক্যান্সার যদি প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় না হয় এবং সময়মত চিকিৎসা শুরু না হয়, তবে ধীরে ধীরে এটি চারপাশের কোষ এবং অঙ্গ সমুহে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। নিচের দিকে এটি যোনিপথে ছড়িয়ে পড়তে পারে, চারপাশে শ্রোণিদেশের ভিতরের মাংসপেশি এবং হাড়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি উপরের দিকে জরায়ু পার হয়ে ডিম্ববাহী নালীতে ছড়িয়ে পরে নালীকে বন্ধ করে দিতে পারে।
ক্যান্সার পিছন দিকে মুত্রথলি এবং মলাশয়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আরো বিস্তৃত হয়ে এটি লিভার, ফুসফুস এবং হাড়ের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। লিম্ফেটিক প্রবাহের (lymphatic system) মাধ্যমে এটি শরীরের অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। লিম্ফেটিক সিস্টেম হলো রক্ত সংবহন তন্ত্রের মত, লিম্ফ নামক অন্য একটি তরলের সংবহন তন্ত্র। শরীরের বিভিন্ন স্থানে যে গ্রন্থি (lymph node) গুলো থাকে, তাদের কাজ হল বিশেষ এক ধরনের কোষ তৈরি করা যা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এই রোগ প্রতিরোধী কোষ গুলো লিম্ফ নামক ঐ বিশেষ তরলে থাকে এবং লিম্ফেটিক প্রবাহের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রবাহিত হয়। অনেক সময় দেখা যায় গলার অথবা বগলের নিচের গ্রন্থি (lymph node) ফুলে গেছে। এর কারন হলো শরীরের কোথাও কোন সংক্রমন হয়েছে এবং সেই সংক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য গ্রন্থি (lymph node) গুলো বেশি বেশি প্রতিরোধী কোষ তৈরি করার জন্য বড় হয়ে গেছে।
জরায়ু মুখের ক্যান্সারের প্রাথমিক অবস্থায় অনেক সময় জরায়ু মুখের কাছাকাছি গ্রন্থিতে ক্যান্সার কোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে, শেষ পর্যায়ে বুকের এবং পেটের গ্রন্থিও আক্রান্ত হতে পারে।
 
মায়া বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে মায়া এন্ড্রয়েড এপ ডাউনলোড করুন এখান থেকে: https://bit.ly/2VVSeZa